সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
এক সময় সল্টলেকের কথা বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠত শান্ত জলাধার, ছায়া ঘেরা হাঁটার পথ আর সবুজ উদ্যান। সেই সৌন্দর্যের কিছুটা এখনও টিকে থাকলেও, আজকের সল্টলেক, বিশেষত সেক্টর ফাইভ ও কাছাকাছি নিউটাউন, হয়ে উঠেছে কাঁচ-লোহার বহুতল ভবনের শহর।
এখানে গড়ে উঠেছে আধুনিক টেক পার্ক, কর্পোরেট অফিস ও আন্তর্জাতিক মানের তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্র—যা কলকাতাকে এনে দিয়েছে "সিলিকন ভ্যালি অফ দ্য ইস্ট"-এর খেতাব। Kolkata IT industry growth
গত সাত বছরে এই অঞ্চলে ১৫০০-রও বেশি আইটি সংস্থা গড়ে উঠেছে, কর্মসংস্থান হয়েছে ২.৬ লাখেরও বেশি মানুষের। কেন্দ্র সরকারের তথ্য অনুযায়ী, কলকাতার আইটি ও আইটি-সাপোর্টেড সার্ভিস (ITeS) রপ্তানি FY18-এ যেখানে ছিল ৬,৬৮৪ কোটি টাকা, FY25-এ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪,২৬৮ কোটি টাকায়। IT boom in Kolkata
বেঙ্গল সিলিকন ভ্যালি এবং নিউটাউনের উত্থান
২০১৮ সালে নিউটাউনের ২৫০ একর জমিতে গড়ে ওঠে বেঙ্গল সিলিকন ভ্যালি (BSV)। ( Silicon Valley of the East ) আধুনিক পরিকাঠামো ও দ্রুত প্রশাসনিক পরিষেবা এই অঞ্চলকে করে তোলে তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কাছে আকর্ষণীয়। কোভিড-১৯ এর সময় বহু প্রযুক্তি কর্মী শহরে ফিরে আসেন, এবং তখনই সংস্থাগুলি বুঝতে পারে—এই শহরে তাদের অনেক কর্মী রয়েছেন, যাঁদের ধরে রাখতে গেলে কলকাতাতেই এক্সপান্ড করা উচিত।

IBM, Microsoft, Wipro, TCS, Tech Mahindra-র মতো সংস্থা অনেক আগেই এখানে বিনিয়োগ করেছিল। ( IT companies in Salt Lake Sector V ) তবে গত তিন বছরে নতুন করে এসেছে Calsoft, Zensar, LTIMindtree, Grant Thornton, McKinsey-এর মতো সংস্থা। এই সংস্থাগুলি মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ স্কোয়ার ফুট জায়গা নিয়েছে এবং তৈরি হয়েছে ২০ হাজারের বেশি চাকরি। (Bengal Silicon Valley project)
সেক্টর ফাইভ: আইটি বিপ্লবের হৃদপিণ্ড
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত সেক্টর ফাইভ-এ ৬৪১টি আইটি ও ITeS সংস্থা কাজ শুরু করেছে—গড়ে বছরে ১৬০টি করে নতুন সংস্থা। ৪৩২ একরের এই অঞ্চলে প্রায় ২৫০টি ভবন, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই আইটি সংস্থা দখল করেছে। (New Town IT hub Kolkata) ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সরকারী তথ্য অনুযায়ী এখানে ১,৫২,২৩১ কর্মী কাজ করছেন। (Kolkata IT job opportunities)
গ্লোবাল ফাউন্ডরিজ-এর মতো আন্তর্জাতিক সেমিকন্ডাক্টর সংস্থাও এখানেই অফিস খোলার ঘোষণা করেছে। ২০২২ সাল থেকে এই অঞ্চলে ৬৭৭০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। (Investment in Bengal IT sector)
নিউটাউনের নতুন চেহারা
সেক্টর ফাইভ থেকে ৫-৬ কিলোমিটার দূরের নিউটাউনের অ্যাকশন এরিয়া II-এ ২৭১৮ একর জমিতে গত তিন বছরে ৩০টি আইটি ভবন ও ৫টি ডেটা সেন্টার অনুমোদিত হয়েছে। (TCS Infosys Wipro Kolkata offices) এর মধ্যে রয়েছে TCS, Infosys, Wipro, EY GDS, Deloitte USI, LTIMindtree, Zensar, Thoughtworks, STT Global, Reliance ও Adani-এর মতো সংস্থা। (NDITA and NKDA IT zones)
Infosys-এর ৩.২ লাখ স্কোয়ার ফুট ক্যাম্পাস ৪২৬ কোটি টাকা বিনিয়োগে তৈরি হয়েছে, উদ্বোধন হয়েছে ডিসেম্বর ২০২৪-এ। ১ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ITC-এর ১৭ একরের আইটি প্রকল্পের জন্য অকুপেন্সি সার্টিফিকেট জারি করেছেন। (Data centres in Kolkata)
বেঙ্গল সিলিকন ভ্যালি: বিনিয়োগের নতুন যুগ
BSV-তে বর্তমানে ৪১টি সংস্থা কাজ করছে, যার মধ্যে রয়েছে ST Telemedia, NTT Data, Airtel Nxtra, CtrlS। মোট ২৭,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ এসেছে, যার বেশিরভাগই ২০২১ পর থেকে। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৭৫,০০০ কর্মসংস্থান হবে। (Tech parks in Kolkata)
TCS এখানে ২০ একর জমি নিয়ে কাজ শুরু করছে, Adani Group ৫০ একর, Reliance Jio ৪০ একর এবং LTIMindtree ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে। LTIMindtree-এর চিফ HR অফিসার চেতনা পटनায়েক জানিয়েছেন, “২০২৬ অর্থবর্ষের শেষের মধ্যে আমরা কলকাতা সেন্টারে ৫,০০০-৬,০০০ কর্মী রাখতে চাই।”
মানবসম্পদ, ভূগোল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুবিধা
Sector V Stakeholders’ Association-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট কল্যাণ করের মতে, Infosys, Wipro ও ITC Infotech-এর মতো সংস্থাগুলোর সম্প্রসারণ ancillary business গুলোকেও টেনে আনছে। এছাড়াও, বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড ও উত্তর-পূর্ব ভারতের জনগোষ্ঠী—যারা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০%—তাদের কাছাকাছি থাকায় এখানে ডেটা সেন্টার তৈরি ও পরিচালনা সহজ হয়েছে। (Indian IT hubs beyond Bengaluru)
কলকাতার মতো শহরে Jadavpur University, IIM Calcutta, IIT Kharagpur, Indian Statistical Institute-এর মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য সহজলভ্য, দক্ষ এবং খরচ সাশ্রয়ী মানবসম্পদ পাওয়া যায়, যারা AI, blockchain, IoT ও সাইবারসিকিউরিটি-র মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ।
বদলে যাওয়া প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি
আজকের বিনিয়োগকারীরা জানেন যে পশ্চিমবঙ্গে প্রশাসনিক কাজ আগের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত। (Government policy for IT in Bengal) বিল্ডিং প্ল্যান বা অকুপেন্সি সার্টিফিকেট মাত্র ৮ কার্যদিবসের মধ্যে মিলছে। “প্রো-অ্যাক্টিভ নীতি ও বিশ্বমানের পরিকাঠামো দিয়ে আমরা ভারতের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছি,” দাবি করেছেন তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। (IT real estate boom Kolkata)
রিয়েল এস্টেট ক্ষেত্রও সমান গতিতে বাড়ছে। (IT real estate boom Kolkata) Merlin Group-এর চেয়ারম্যান সুশীল মোহতা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে ১৯ লক্ষ স্কোয়ার ফুট ও ২০২৪ সালে ২২ লক্ষ স্কোয়ার ফুট অফিস স্পেস কলকাতা বাজারে এসেছে। (Kolkata as an emerging IT hub)
চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে
তবে সবকিছুর মধ্যেও কিছু স্থায়ী সমস্যা রয়েছে। অনেক নতুন আইটি চাকরি এখনও অপেক্ষাকৃত কম বেতনের। অন্যান্য মেট্রো শহরের মতো বহিরাগত উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-ব্যয়কারী কর্মীর দল কলকাতায় আসতে চাইছে না। এক প্রবীণ আইটি কর্তার মতে, “শুধু চাকরি থাকলেই হবে না, দরকার প্রতিযোগিতামূলক বেতন, ভবিষ্যৎ কেরিয়ার গ্রোথ ও এক আকর্ষণীয় জীবনধারা।” (Cost-effective IT talent in Bengal)
২০২৫ সালের মার্চে রাজ্য সরকার কিছু শিল্প সুবিধা প্রত্যাহার করেছে—যা নতুন বিনিয়োগে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া আধুনিক ও উদ্ভাবনী আইটি নীতির ঘাটতি আগামীদিনে সমস্যার কারণ হতে পারে। যদিও সেক্টর ফাইভ ও নিউটাউনে ভালো সাড়া মিলেছে, বাকি রাজ্যের ২৬টি আইটি পার্ক এখনও অনেকটাই খালি পড়ে রয়েছে। (Kolkata digital economy)
NASSCOM-এর প্রাক্তন সভাপতি আর. চন্দ্রশেখরের মতে, “কলকাতাকে সত্যিকারের আইটি শহরে পরিণত করতে হলে এটিকে এমন এক শহরে রূপান্তর করতে হবে, যেখানে বাইরের রাজ্য থেকে আসা মানুষও থাকতে ও কাজ করতে চাইবেন।”
একসময় পরাধীনতার ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির শহর হিসেবে পরিচিত কলকাতা আজ তথ্যপ্রযুক্তির নতুন যুগে প্রবেশ করছে। পরিকাঠামো, নীতিগত সহায়তা, শিক্ষাগত পরিকাঠামো ও ভৌগলিক অবস্থান—সব মিলিয়ে কলকাতা এখন একটি শক্তিশালী ডিজিটাল অর্থনীতির কেন্দ্র হয়ে উঠছে। তবে এই পথচলা সম্পূর্ণ করতে গেলে দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারাবাহিকতা দরকার—কারণ, সামনে সুযোগ অনেক, কিন্তু সময় সীমিত।