রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে আবারও আলোচনায় স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি)। দাগি অযোগ্য প্রার্থীদের থেকে টাকা উদ্ধার হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নেই এবার সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হল কমিশনকে। শুক্রবার এই প্রসঙ্গে এসএসসি-র আইনজীবীকে একাধিক প্রশ্ন করেন বিচারপতি। আদালতের প্রশ্ন—যাঁরা বেআইনি ভাবে চাকরি নিয়েছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে কি টাকা ফেরত আনা হয়েছে? জবাবে কমিশনের তরফে জানানো হয়, এখনও সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
চাকরিহারাদের আর্জি ও আদালতের অবস্থান
মামলার সূত্রপাত চাকরিহারা যোগ্য প্রার্থীদের একাংশের আর্জি থেকে। অভিযোগ, তাঁরা দাগি নন, তবুও তাঁদের পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয়নি। এই যুক্তি আদালতে শোনার পর মামলাটি খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। তবে সেখানেই শেষ হয়নি বিতর্ক। আদালত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, দাগিদের থেকে টাকা উদ্ধার প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করা প্রয়োজন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পরীক্ষার পর পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—যাঁরা দাগি, তাঁরা কোনওভাবেই ভবিষ্যতের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন না।
দাগি তালিকা নিয়ে প্রশ্নের মুখে এসএসসি
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে এসএসসি প্রকাশিত দাগি তালিকা ঘিরে। কমিশন জানিয়েছে, মোট ১৮০৬ জন প্রার্থীর নাম এই তালিকায় রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ, প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা অনেক বেশি। আদালতে এমনই দাবি করে এক চাকরিহারা যোগ্য প্রার্থী। এমনকি আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তালিকায় বহু দাগির নামই বাদ পড়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট তাই নির্দেশ দিয়েছে, তালিকাটি নতুন করে যাচাই করতে হবে। যাঁদের বেআইনিভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের নাম যেন বাদ না যায়, সেই দিকেও নজর রাখতে হবে কমিশনকে।
তৃণমূল নেতাদের পরিবার নিয়েও বিতর্ক
দাগি তালিকা প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে রাজনীতির ময়দান উত্তপ্ত। অভিযোগ উঠেছে, একাধিক তৃণমূল নেতার আত্মীয়-পরিজনের নাম এই তালিকায় রয়েছে। কারও মেয়ে, কারও বউমা বা স্বামী—এইসব নাম সামনে আসতেই বিরোধীরা তোপ দেগেছে শাসকদলের বিরুদ্ধে। বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে কোনও পরীক্ষাই দুর্নীতিমুক্ত নয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া কেবল দুর্নীতির জাল বিস্তার করেছে।
আদালতের সতর্কবার্তা
বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও এসএসসি দাগিদের তালিকা প্রকাশে পুরোপুরি স্বচ্ছতা দেখাতে পারেনি বলে মন্তব্য আদালতের। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, শুধু তালিকায় নাম থাকা দাগিরাই নয়, যাঁরা স্কুলে যোগই দেননি কিন্তু অবৈধভাবে নিয়োগপত্র পেয়েছেন, তাঁদেরও যেন নতুন পরীক্ষায় বসতে না দেওয়া হয়।
আদালতের মতে, কমিশনের কাজ কেবল তালিকা প্রকাশ নয়, সেই তালিকা যাচাই করা ও সঠিক ব্যবস্থা নেওয়াও সমান জরুরি। নচেৎ পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার উপর মানুষের আস্থা থাকবে না।
নিয়োগ নিয়ে বিভ্রান্তি
এদিন আদালতে শোনা যায়, প্যানেলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রায় ৩০০০ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই তথ্য সামনে আসতেই আরও প্রশ্ন ওঠে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে। যদিও এসএসসি-র আইনজীবীর দাবি, ওই প্রার্থীদের পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হয়েছিল। আদালত জানিয়েছে, এই তথ্যও পরীক্ষার পর খতিয়ে দেখা হবে।
সার্বিক চিত্র
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে রাজ্যে বরাবরই তীব্র রাজনৈতিক তরজা চলছে। রাজনীতির বাইরে গিয়ে এখন বিষয়টি পুরোপুরি বিচারব্যবস্থার অধীনে। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে একদিকে যেমন যোগ্য প্রার্থীদের আশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে কমিশনের কাজের স্বচ্ছতা নিয়েও উঠছে একের পর এক প্রশ্ন।
এসএসসি-কে আদালতের নির্দেশ, বেআইনি ভাবে যাঁরা চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু তাই নয়, দাগিদের থেকে টাকা উদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরুও করতে হবে। আদালতের মতে, দুর্নীতির টাকা ফেরত আসাই উচিত।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, এই মামলার রায় ও পরবর্তী পদক্ষেপ রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে। কারণ, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফের প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এসএসসি-র কাছে।