শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
ভারতের প্রত্যেক মোবাইল ব্যবহারকারীর মোবাইলে বাধ্যতামূলক ভাবে ইন্সটল করতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারের সঞ্চার সাথী অ্যাপ। যার মাধ্যমে যে কোন মোবাইল ব্যবহারকারীর প্রত্যেকটি গতিবিধির উপরে প্রত্যক্ষ নজরদারি রাখতে পারবে কেন্দ্রীয় সরকার। দেশে বর্তমানে যাদের মোবাইল হ্যান্ডসেট রয়েছে সেগুলিতে নতুন করে এই অ্যাপ যেমন বাধ্যতামূলকভাবে ইনস্টল করতে হবে ঠিক তার পাশাপাশি ভারতে এখন থেকে যত মোবাইল তৈরি বা বিক্রি হবে সেগুলিতেও প্রথম থেকেই প্রি ইনস্টল করে রাখতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারের এই নজরদারি অ্যাপ। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দেশ জুড়ে জারি হল নির্দেশিকা। আর এই নির্দেশিকাকে মোদি সরকারের হিটলারের ফতোয়া বলে দাবি করে কেন্দ্র আদতে প্রত্যেকে দেশবাসীর ফোনে পেগাসাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাদের প্রতি মুহূর্তের উপরে নজরদারি চালাতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছে দেশের প্রত্যেকটি বিরোধী রাজনৈতিক দল।
তবে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এই বিজ্ঞপ্তি জারি করার পরে দেশ জুড়ে সমস্ত রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে তীব্র বিরোধিতা এবং সমালোচনা শুরু হওয়ার পরেই আজ বিকেলে কিছুটা হলেও পিছু হটল কেন্দ্রীয় সরকার।
কি রয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে
সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং টেলিকম প্রতারণা মোকাবিলা করার জন্য এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকমিউনিকেশনস (ডিওটি) সম্প্রতি এক নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে, যেখানে দেশের সমস্ত মোবাইল হ্যান্ডসেট প্রস্তুতকারক ও আমদানিকারকদের জন্য তাদের ডিভাইসে রাষ্ট্র-পরিচালিত সাইবার নিরাপত্তা অ্যাপ সঞ্চার সাথী প্রি-ইনস্টল করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ২৮ নভেম্বর এই নির্দেশিকা সরাসরি পাঠানো হয়েছে বড় বড় স্মার্টফোন নির্মাতা সংস্থাগুলির কাছে। জানানো হয়েছে, ফোন তৈরির পরেই তাতে লোড করে দিতে হবে সঞ্চার সাথী। আগামী ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে করতে হবে এই ব্যবস্থা। প্রি-ইনস্টলড ওই অ্যাপ চাইলেও আনইনস্টল করা যাবে না। কেন্দ্রের দাবি, সাইবার জালিয়াতি মোকাবিলাতেই এই পদক্ষেপ। সফ্টওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে এই অ্যাপটি ফোনে চলে আসবে। মোবাইল হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে তা আসল কিনা তা পরীক্ষা করবে। সন্দেহভাজন প্রতারণামূলক কল বা মেসেজ রিপোর্ট করবে। হারিয়ে যাওয়া বা চুরি যাওয়া ফোনের রিপোর্ট করবে। আপনার নামে ইস্যু করা সমস্ত মোবাইল সংযোগ দেখবে।
তীব্র বিরোধিতা দেশজুড়ে
বিরোধী দলগুলি কেন্দ্রের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে, এটিকে অসাংবিধানিক এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারি সক্ষম করার প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করেছে। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কেসি বেণুগোপাল এই নির্দেশিকার বিরোধিতা করে এটিকে সংবিধানিকের বাইরে বলে অভিহিত করেছেন। এক্স পোস্টে তিনি বলেন, বিগ ব্রাদার এভাবে জোর করে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনযাপ দেখতে পারে না। জীবনের মৌলিক অধিকারের মধ্যে রয়েছে গোপনীয়তার অধিকার, এটি আর্টিকেল ২১-এর অধীনে। তিনি সঞ্চার সাথীকে প্রত্যেক ভারতীয়কে পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি ডিস্টোপিয়ান হাতিয়ার হিসাবে বর্ণনা করে বলেন, এটি নাগরিকদের প্রতিটি গতিবিধি, মিথস্ক্রিয়া এবং সিদ্ধান্তের উপর নজর রাখবে। কংগ্রেস অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে, আদেশকে সাংবিধানিক অধিকারের উপর নিরন্তর আক্রম’-এর একটি নমুনা বলে অভিহিত করেছে। শিবসেনা (ইউবিটি) সাংসদ প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এই নির্দেশিকা যেন বিগ বসের মতো নজরদারির চেষ্টা।কেন্দ্র গোপনে নাগরিকের ফোনে প্রবেশের জন্য আইন তৈরি করছে এবং এই ধরনের প্রযুক্তিগত নজরদারি তীব্র প্রতিরোধের মুখোমুখি হবে। নাগরিকের অভিযোগ নিষ্পত্তির শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলার বদলে আইটি মন্ত্রক নজরদারি ব্যবস্থারই প্রসার ঘটাতে ব্যস্ত।
বিরোধীরা অনেকেই সঞ্চার সাথী অ্যাপটিকে কুখ্যাত পেগাসাস স্পাইওয়্যারের সঙ্গে তুলনা করছেন। এক্স পোস্টে কংগ্রেস সাংসদ কার্তি চিদাম্বরম লিখেছেন, এটা পেগাসাস প্লাস প্লাস। সরকারের হাতে চলে যাবে আমাদের ফোন, আর আমাদের ব্যক্তিগত জীবন।
তীব্র বিরোধিতায় পিছু হটল কেন্দ্র
সঞ্চার সাথী অ্যাপ ফোনে রাখা বাধ্যতামূলক নয়, বরং ঐচ্ছিক। কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার পরে দেশ জুড়ে তীব্র বিরোধিতা এবং সমালোচনা শুরু হওয়ার পরে আজ সংসদে এমনটাই দাবি করলেন কেন্দ্রীয় টেলিকম মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া।
কেন বিতর্ক?
প্রথমে জানা গিয়েছিল, এই অ্যাপ সব মোবাইলে রাখা বাধ্যতামূলক। এটিকে ডিলিট করা বা স্টপ করা যাবে না। এমনকী পুরনো ফোনেও সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে এই অ্যাপ ইনস্টল করা হবে। আর এই সিদ্ধান্ত নিয়েই তৈরি হয় বিতর্ক।

সঞ্চার সাথীতে আপত্তি স্যামসাং ও অ্যাপলের
কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত মোবাইল নির্মাতা সংস্থাকে আগামী সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে সমস্ত হ্যান্ডসেটে সঞ্চার সাথী অ্যাপটি প্রি ইনস্টল করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলেও এই নির্দেশ এখনই মানতে নারাজ মোবাইল ফোন নির্মাতা সংস্থা অ্যাপল। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই নির্দেশ কার্যকরের বিষয়ে অ্যাপল কর্তৃপক্ষের আপত্তি রয়েছে। বাধ্যতামূলক ভাবে সঞ্চার সাথী অ্যাপ স্মার্টফোনে প্রি-ইনস্টল করার সরকারি নির্দেশের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বৈঠক করতে চলেছে মোবাইল প্রস্তুতকারী সংস্থা অ্যাপল। একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আরেক মোবাইল প্রস্তুতকারক সংস্থা স্যামসাং।