সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে মুর্শিদাবাদে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি উত্তপ্ত করার অভিযোগে ভরতপুরের তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকে সাসপেন্ড করল তৃণমূল। বৃহস্পতিবার সকালে সাংবাদিক বৈঠক করে দলের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করলেন ফিরহাদ হাকিম। এদিন ফিরহাদ সাংবাদিক বৈঠকে জানান, দল হুমায়ুনের সঙ্গে কোনও রকমের সম্পর্ক রাখবে না। ধর্ম নিয়ে যাঁরা বিভাজনের রাজনীতি করেন, তাঁদের সঙ্গে দল কোনও সম্পর্ক রাখবে না। তৃণমূল কোনও দিন ধর্ম নিয়ে রাজনীতি বরদাস্ত করবে না।
একদিকে যখন মুর্শিদাবাদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় হাজির হুমায়ুন, অন্যদিকে তখনই সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত জানালেন ফিরহাদ। শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে এই সিদ্ধান্ত বলে জানাল তৃণমূল। সাসপেন্ডের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে হুমায়ুনের বক্তব্য, ‘ববিদার কথার জবাব দেব না। কালই দল ছাড়ব।’
হুমায়ুন কবীর মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদ তৈরি করার কথা বলেছিলেন। শুধু তাই নয়, ৬ ডিসেম্বরই তার শিলান্যাস করার ঘোষণা করেছিলেন। বাবরি মসজিদ নিয়ে মন্তব্য ঘিরেই বিতর্কের সূত্রপাত। এরপরই তৃণমূল হুমায়ুনের থেকে দূরত্ব তৈরি করে। বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠকে ফিরহাদ জানান, ৩ বার তাঁকে শোকজ করা হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টায়নি। তাই দল থেকে এবার তাঁকে সাসপেন্ড করা হল।
অন্যদিকে ঘটনাচক্রে বৃহস্পতিবার মুর্শিদাবাদেই জনসভা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখান থেকে হুমায়ুন কবীরের নাম না করে মমতা বলেন, ‘আপনারা জানেন, সিরাজউদ্দৌলা মীরজাফরের মাথায় মুকুট পরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তুমি ভেঙো না, স্বাধীনতাকে চলে যেতে দিও না। সম্মান রক্ষা করো। আমি আমার মুকুট তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি। কিন্তু তুমি আমাদের স্বাধীনতাকে রক্ষা করো। কিন্তু সেদিন সিরাজউদ্দৌলা এত বড় সম্মান দেখানোর পরেও, মীরজাফর সেটা করতে দেননি। কিন্তু, সিরাজউদ্দৌলার নাম আজও ঘরে ঘরে পূজিত হয়। তার কারণ, তিনি চেয়েছিলেন দেশটা ভাল থাকুক। সেটা একটা ইতিহাস। মুর্শিদাবাদ জেলার মানুষ দাঙ্গা পছন্দ করে না। অনেক সময় আমরা অনেক বড় বড় দাঙ্গা দেখলেও, মর্শিদাবাদের মানুষ কিন্তু দাঙ্গার রাজনীতি করেন না। এমনকী ২০০৬ সালে ৬ ডিসেম্বর যে দিনটা আমরা সম্প্রীতি দিবস হিসাবে আজ ৩৩ বছর ধরে পালন করে আসছি, মনে রাখবেন…আমরা সবাই মিলে করি সর্ব ধর্মের মানুষকে নিয়ে। সেদিনও কিন্তু মুর্শিদাবাদে দাঙ্গা হয়নি। মাঝে ধূলিয়ানে একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমি নিজে এসেছিলাম। জঙ্গিপুরে একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি সংখ্যালঘু ভাইদের ফোন করেছিলাম। পুরসভার চেয়ারম্যানকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে সংখ্যালঘু ভাই-বোনদের বলেছিলাম, তোমরা রক্ষা করো। যাতে হিন্দুদের ওপর কোনও অত্যাচার না হয়। নিয়ম তো এটাই। মেজোরিটি যাঁরা আছেন, তাঁরা মাইনোরিটিদের রক্ষা করবেন। আর যাঁরা মাইনোরিটি আছেন, তাঁরা মেজোরিটিদের রক্ষা করবেন। এটাই সর্ব ধর্ম সমন্বয়। সবাইকে নিয়ে চলতে হবে। আমাদের শরীরে হাত যেমন থাকে, পা-ও থাকে। কিডনি-হার্ট-লিভার-গলব্লাডারও থাকে। এক একটা ধর্মের এক একটা ধর্মীয় আচরণ। সব ধর্মকে আমরা শ্রদ্ধা করি। কিন্তু, আমরা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সম্মান জানাই না। আমরা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। সে যে-ই হোক। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমরা রক্ষা করতে চাই। এটা আমাদের সংবিধান শিখিয়েছে।’
অন্যদিকে হুমায়ুন সরাসরি মমতাকে আক্রমণ করে বলেন, ‘এরকম আরএসএস মার্কা মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ে ডাইরেক্ট বিজেপির কেউ মুখ্যমন্ত্রী হলে আমি ওয়েলকাম জানাব।’ তিনি আরও বলেন, ‘কারও ক্ষমতা থাকলে আমাকে আটকাক। আমার জীবনের বিনিময়েও হলেও বাবরি মসজিদের শিলান্যাস করব। মুসলমানদের টাকায় আমি মসজিদ তৈরি করব। আমার ঘোষণার পিছনে আমি অটল। আমি এই সাসপেনশনকে স্বাগত জানাচ্ছি। দলের কোনও সাংগঠনিক পদে হুমায়ুন কবীর ছিল না। এখনই নেই। কাজেই তৃণমূল কংগ্রেস থেকে সাসপেন্ড হওয়াটা আমার কাছে গুরুত্বহীন। আমার কাছে আকস্মিক আঘাত আসারও বিষয় নয়। এর যোগ্য জবাব তৃণমূল রাজ্য থেকে ক্ষমতাচ্যুত করে এর খেসারত দেবে। আমি একজন মুসলিম। বাবরি মসজিদ করার জন্য আমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। তাতে আমার জীবন চলে গেলে যাবে। আমি শহিদ হলে হব। কিন্তু আমি পিছু হটব না। ৬ তারিখে বাবরি মসজিদের শিলান্যাস হবেই।’