প্রিয়াঙ্কা মান্না। কলকাতা সারাদিন।
উত্তর সিকিম মানেই অধিকাংশ পর্যটকের মনে ভেসে ওঠে লাচুং, ইয়ুমথাং ভ্যালি কিংবা জিরো পয়েন্টের ছবি। কিন্তু এই পরিচিত নামগুলোর আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে এমন এক গন্তব্য, যা একবার চোখে পড়লে আর ভুলে থাকা অসম্ভব—মাউন্ট কাটাও।
লাচুং থেকে মাত্র ২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই তুষারমণ্ডিত পাহাড়চূড়া অনেকের কাছেই আজও অচেনা। অথচ প্রকৃতির যে রূপ এখানে ধরা দেয়, তা দেখলে স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়—সিকিমের বুকেই যেন এক টুকরো সুইজারল্যান্ড।
মাউন্ট কাটাওয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নিঃশব্দ, অকৃত্রিম সৌন্দর্য। এখানে নেই পর্যটকদের ভিড়, নেই দোকানপাট বা কোলাহল। আছে শুধু পাহাড়, বরফ, আকাশ আর হিমালয়ের নিস্তব্ধতা। এই নির্জনতাই মাউন্ট কাটাওকে আলাদা করে তোলে উত্তর সিকিমের অন্য সব জায়গা থেকে।
প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা এক শীতল স্বপ্ন
মাউন্ট কাটাও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫,০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। এই উচ্চতার কারণে বছরের বেশির ভাগ সময়ই পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকে পুরু বরফের চাদর। শীতকালে গোটা অঞ্চল ঢেকে যায় ধবধবে সাদা বরফে—দূর থেকে দেখলে মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজের হাতে সাদা মখমলের গালিচা পেতে রেখেছে। সূর্যের আলো পড়লে বরফের ওপর ঝিলমিল করে ওঠে রুপোলি আভা, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
বসন্ত আর গ্রীষ্মের শুরুতে বরফ কিছুটা গললে পাহাড়ের ঢালে ফুটে ওঠে রডোডেনড্রন, প্রিমুলা আর হিমালয়ান পপি ফুল। চারদিকে পাইন ও ফার গাছের সারি, তার ফাঁক দিয়ে বইছে বরফঠান্ডা বাতাস। দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জের বিশাল উপস্থিতি এই দৃশ্যকে আরও নাটকীয় করে তোলে।

যাত্রাপথই এক আলাদা অভিজ্ঞতা
লাচুং থেকে মাউন্ট কাটাওয়ের যাত্রা নিজেই একটি অ্যাডভেঞ্চার। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে গাড়ি যত ওপরে ওঠে, ততই বদলে যেতে থাকে প্রকৃতির রূপ। কখনও গভীর খাদ, কখনও খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনা, আবার কোথাও রাস্তার পাশে জমে থাকা বরফ—সব মিলিয়ে এই পথ একেবারেই সিনেমার দৃশ্যের মতো।
শীতকালে অনেক ঝরনাই বরফে পরিণত হয়, তৈরি করে প্রাকৃতিক আইসফল। তবে এই সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে সতর্কতাও জরুরি। কারণ মাউন্ট কাটাও চীন সীমান্তের খুব কাছে অবস্থিত, ফলে আবহাওয়া খারাপ হলে বা নিরাপত্তাজনিত কারণে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
সেনা এলাকা ও পারমিটের বাধ্যবাধকতা
মাউন্ট কাটাও একটি সংবেদনশীল সামরিক এলাকা। এখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি রয়েছে। নিরাপত্তার কারণে পর্যটকদের মূল চূড়ায় পৌঁছনোর আগেই থামতে হয়। এই অঞ্চলে প্রবেশের জন্য অবশ্যই ইনার লাইন পারমিট (ILP) প্রয়োজন, যা গ্যাংটক বা লাচুং থেকেই সংগ্রহ করতে হয়।
অনেক সময় আবহাওয়া বা সেনাবাহিনীর নির্দেশে পর্যটকদের প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। তবে অনুমতি মিললে যে অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়, তা আজীবনের স্মৃতি হয়ে থেকে যায়।
রোমাঞ্চপ্রেমীদের স্বর্গ
যাঁরা অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য মাউন্ট কাটাও নিঃসন্দেহে স্বপ্নের জায়গা। এখানে স্নো-বোর্ডিং, স্কিইং এবং স্লেজিংয়ের মতো নানা বরফের খেলা উপভোগ করা যায়। সিকিমে বরফ নিয়ে এমন খোলামেলা আনন্দ করার জায়গা হাতে গোনা।
উচ্চতা বেশি হওয়ায় এখানকার তাপমাত্রা অনেক সময় হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায়। তাই ভারী জ্যাকেট, গ্লাভস, উলের টুপি এবং সঠিক জুতো সঙ্গে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
কখন যাবেন, কোথায় থাকবেন?
মাউন্ট কাটাও ভ্রমণের সেরা সময় মার্চ থেকে জুন। এই সময় আবহাওয়া তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে এবং পাহাড়ে ফুলের রং দেখা যায়। বরফপ্রেমীদের জন্য ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি আদর্শ, যদিও তখন ঠান্ডা অত্যন্ত বেশি।
মাউন্ট কাটাওয়ে থাকার কোনও ব্যবস্থা নেই। পর্যটকদের লাচুংতেই থাকতে হয়। লাচুং-এ বেশ কিছু ভালো হোমস্টে ও মাঝারি মানের হোটেল রয়েছে। সেখান থেকেই ভোরবেলা গাড়ি নিয়ে মাউন্ট কাটাওয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া হয়।

ভিড়ের বাইরে গিয়ে প্রকৃতিকে একদম কাছ থেকে অনুভব করতে চাইলে মাউন্ট কাটাওয়ের তুলনা নেই। এখানে নেই শহরের কোলাহল, নেই পর্যটনের বানিজ্যিক চমক। আছে শুধু হিমালয়ের নীরবতা, বিশুদ্ধ বাতাস আর এক অপার্থিব সৌন্দর্য। উত্তর সিকিম ভ্রমণ যদি সত্যিই সম্পূর্ণ করতে চান, তাহলে আপনার পরের ট্রাভেল লিস্টে মাউন্ট কাটাও রাখতেই হবে।