সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
“এখনই বলা উচিত নয়, যে আমরা পরীক্ষা দেব না। তাহলে তো চাকরিটাই থাকবে না। ৩০ মে পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি দেবে সরকার।” সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চাকরি হারানো শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য নতুন করে চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার ঘোষণা করে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, “আমরা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মানতে বাধ্য হচ্ছি। যদিও আমরা রিভিউ পিটিশন দায়ের করেছি এবং সেই রায়ের অপেক্ষায় আছি, তবে আপাতত বিজ্ঞপ্তি জারির নির্দেশ পালন করতেই হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “পরীক্ষাতে বসব না- এই মানসিকতা রাখলে চলবে না। দুটো অপশনই খোলা রাখতে হবে।”
নিয়োগ প্রক্রিয়া ও সময়সীমা
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, ৩০ মে রাজ্য সরকার নিয়োগ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন প্রকাশ করবে। ১৬ জুন থেকে অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং তা ১৪ জুলাই পর্যন্ত চলবে। এর পর, ১৫ নভেম্বর প্যানেল প্রকাশ করা হবে এবং ২০ নভেম্বর কাউন্সেলিং অনুষ্ঠিত হবে।
মঙ্গলবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “২৪ হাজার ২০৩ জন শূন্যপদ ছাড়াও আরও বেশি কিছু শূন্যপদ তৈরি করা হয়েছে। কারণ অনেক খালি পোস্ট আছে। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে নবম-দশম শ্রেণির জন্য অতিরিক্ত ১১ হাজার ৫১৭ শূন্যপদ তৈরি করা হয়েছে। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির জন্য ৬ হাজার ৯১২ শূন্যপদ। গ্রুপ সি-তে ৫৭১ এবং গ্রুপ ডি-তে এক হাজার শূন্যপদ তৈরি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে শূন্যপদের সংখ্যা ৪৪ হাজার ২০৩। চাকরিহারাদের নিয়ে নবম-দশম শ্রেণির ক্ষেত্রে শূন্যপদ ২৩ হাজার ২১২, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ক্ষেত্রে শূন্যপদ ১২ হাজার ৫১৪। পাশাপাশি গ্রুপ সি- ক্ষেত্রে ২ হাজার ৯৮৯ এবং গ্রুপ ডি-র জন্য মোট শূন্যপদ ৫ হাজার ৪৮৮।”
নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে ৩১ মের মধ্যে আমরা বিজ্ঞপ্তি জারি করব। আইনি পরামর্শ নিয়ে ৩০ মে আমাদের বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। বিকল্প পথ খুলে রেখে আমরা বিজ্ঞপ্তি জারি করব। ১৬ জুন থেকে ১৪ জুলাই অনলাইনে আবেদন করা যাবে। হাতে সময় রেখে ১৪ জুলাই অনলাইনে আবেদনের শেষ দিন। রিভিউ পিটিশনের সময় রেখে ১৫ নভেম্বর প্যানেল প্রকাশ। রিভিউ পিটিশনে কিছু না হলে নভেম্বরের মধ্যেই কাউন্সেলিং।”
চাকরিহারাদের প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর মানবিক বার্তা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছেন, “আমি চাই না একজনও চাকরিহারা শিক্ষক চাকরি হারান।” তিনি আরও বলেন, “যেহেতু রিভিউ এখনও শোনা হয়নি, তাই বাধ্য হয়ে ৩১ মে’র মধ্যে বিজ্ঞপ্তি দিতে হচ্ছে। তবে রিভিউতে আমরা যদি জয়ী হই, তখন ফের নতুন করে বিষয়টি ভাবা যাবে।”

মুখ্যমন্ত্রী এদিন জানান, যাঁরা ইতিমধ্যেই শিক্ষকতা করেছেন, তাঁরা অভিজ্ঞতার নিরিখে পরীক্ষার ক্ষেত্রে ছাড় পাবেন এবং তাঁদের জন্য পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দফতরে চাকরির সুযোগ তৈরি করা হবে। রাজ্যে বর্তমানে প্রায় ৪৪,২০৩টি শূন্যপদ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। যাঁরা বয়সসীমা পার করে গিয়েছেন, তাঁদের জন্যও বিশেষ ছাড়ের ভাবনা রয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “মানবিকতার খাতিরে তাঁদের পুনরায় কাজের সুযোগ দেওয়া উচিত। সরকার দুই থেকে তিনটি বিভাগে অতিরিক্ত নিয়োগের কাঠামো তৈরি করবে।”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষকদের চাকরি কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের নয়, এটি সুপ্রিম কোর্টের আদেশ। তবে আমরা কোনো শিক্ষককে পথে বসতে দেব না। যেভাবে ত্রিপুরা বা উত্তরপ্রদেশে আজও শিক্ষকরা চাকরি ফিরে পাননি, বাংলায় আমরা সেটা হতে দেব না।”
অন্যদিকে, নিয়োগ দুর্নীতিতে চাকরিহারা গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি কর্মীদের অন্য দফতরে নিয়োগ করা হবে। দিন কয়েকের মধ্যেই সেই নির্দেশিকা জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার বিকেলে নবান্নে এক সাংবাদিক বৈঠকে একথা জানান তিনি। মমতার দাবি, সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডির চাকরিহারাদের অন্য বিভাগে নিয়োগে কোনও বাধা নেই।
এদিন মমতা বলেন, “গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডির যাদের চাকরি চলে গিয়েছে তাদের অন্য দফতরে নিয়োগ করবে রাজ্য সরকার। সেজন্য বেশ কয়েকটি দফতর নির্বাচন করা হয়েছে। চাকরিহারাদের অপশন দেওয়া হবে। সেখান থেকে তারা বেছে নিতে পারবেন। সব দফতরেই তো আমাদের লোক দরকার হয়। অনেক স্কুলে তো ঘণ্টা বাজানোর লোক নেই। ৩১ মে শিক্ষকদের নতুন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারির পর আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে আমরা কয়েকদিনের মধ্যে এব্যাপারে বিজ্ঞপ্তি জারি করব।”

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৬ সালের প্যানেলের সমস্ত গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি কর্মচারীর চাকরি চলে গিয়েছেন। সপ্তাহ কয়েক আগেই তাদের জন্য ভাতা ঘোষণা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে ইতিমধ্যে মামলা দায়ের হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে। এবার দুর্নীতির দায়ে চাকরিহারাদের পুনর্নিয়োগের ব্লু প্রিন্ট জানালেন মুখ্যমন্ত্রী।