সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
“বাংলা ভাষায় কথা বললে বাংলাদেশি বলা হচ্ছে। বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। লজ্জা করে না আপনাদের! আধার কার্ড, প্যান কার্ড এবং অন্য পরিচয়পত্র থাকার পরেও শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে মহারাষ্ট্রে বিজেপি সরকার এই কাজ করেছে। আমি তাদের ধিক্কার জানাই।” আজ রাজ্য বিধানসভায় এমন বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যে সব জায়গায় বিজেপির ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার রয়েছে, সেখানেই এই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ মমতার।
মহারাষ্ট্রে কাজ করতে যাওয়া তিন পরিযায়ী শ্রমিককে সম্প্রতি বাংলাদেশি সন্দেহে মুম্বই পুলিশ আটক করে। তাঁদের পাকড়াও করে বাংলার প্রশাসনকে না জানিয়েই পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে ঘটনাটি পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক উন্নয়ন পর্ষদের নজরে আসে। রাজ্য প্রশাসনের উদ্যোগে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তরফে ফ্ল্যাগ মিটিং করে ওই তিন জনকে আবার ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়। রাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান তথা তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম রবিবারই এই ঘটনার কথা মুখ্যমন্ত্রীকে জানান। এর পরে সোমবার বিধানসভার অধিবেশনে বক্তৃতার সময় মহারাষ্ট্রের ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন মমতা।
তীব্র আক্রমণ সুকান্তকে
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তব্য রাখা শুরু করলেই হই হট্টগোল শুরু করেন বিজেপি বিধায়করা। সেই ইস্যুতে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরকে উদ্দেশ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমি বিধানসভায় পা রাখলেই ওদের আর কোনও প্রশ্ন থাকে না। বিতর্ক করার মতো যুক্তিও থাকে না। তাই এখন গায়ে পড়ে অপপ্রচার চালায় আর স্লোগান দেয়।” এরপরেই বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের নাম না করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আপনাদের হাফ মিনিস্টার আমাদের পাড়ায় গিয়ে এক পাঞ্জাবি অফিসারকে জুতো ছুঁড়ে মারেন। এটাই কি রাজনৈতিক শালীনতা? আমার বাড়িতে আপনি ঢোকার চেষ্টা করলে, আমরাও আপনার বাড়ির ঠিকানা জানি। বাড়াবাড়ি করলে জবাব পাবেন। আপনারা তো গদ্দারদের আশ্রয় দেন। যারা দেশ বিক্রি করেছে, তাদের হাত শক্ত করেন। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নেই। আর বড় বড় কথা বলছেন! যেদিন গুজরাতে ঘটনাটা ঘটেছিল, আমরা রাজনৈতিক সৌজন্যের কারণে চুপ ছিলাম। কিন্তু সেই সৌজন্যের অপব্যবহার করবেন না। এত যদি হাওয়াই চটি ভালো লাগে, তা হলে হাওয়াই চটির দোকান দিন। ব্যবসা মন্দ হবে না!”
আমার সব ফাইল কেন্দ্রের কাছে আছে
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে বিজেপির তোলা প্রশ্নের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমার সব ফাইল কেন্দ্রের কাছে আছে। আমি চলে আসার পরও ওরা একটাও ফাইল ছাড়েনি। দেখেছে — কিছু পায়নি। আমি এক পয়সা বেতন নিই না। সার্কিট হাউজে থাকা-খাওয়ার খরচ নিজের পকেট থেকেই দিই। আমার খাওয়াদাওয়া, পোশাক-আশাক, ওদের ঠিক করার অধিকার নেই। কে কী খাবে, পরবে—তা নিয়ে মন্তব্য করার সাহস কোথা থেকে আসে? ২০২৬ সালে আপনারা রাজনীতিতে শূন্য হয়ে যাবেন। মানুষ সব বুঝে গেছে।”
নতুন ওবিসি তালিকা প্রসঙ্গে
নতুন ওবিসি তালিকায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর আধিক্য নিয়ে বিজেপির অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, “রাজ্যে ২৬ শতাংশ এসসি এবং ৬ শতাংশ এসটি সংরক্ষণ রয়েছে, এঁদের সবাই হিন্দু।
রাজ্যে ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু রয়েছে। পিছিয়ে থাকা সংখ্যালঘুদের খেতে দেব না, পরতে দেব না এটা হতে পারে না।” মুখ্যমন্ত্রী ইঙ্গিত দেন যে, নির্দিষ্ট কিছু মহল সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করার চেষ্টা করছে, যা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। তিনি স্পষ্ট করেন যে, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার ভিত্তিতে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বাংলার প্রতি কেন্দ্রীয় বঞ্চনা
বিধানসভায় কেন্দ্রীয় বঞ্চনার প্রসঙ্গ তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আজ সারা ভারতবর্ষ জুড়ে মৃত্যু মিছিল চলছে লজ্জা করে না? চোরেদের সরকার, রোজ মানুষের মৃত্যু মিছিল তাও লজ্জা করে না।” তাঁর এই মন্তব্য বিধানসভায় তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। তিনি অভিযোগ করেন যে, কেন্দ্র রাজ্য থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করলেও বাংলাকে বঞ্চনা করছে এবং ১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে রেখেছে, যদিও সমস্ত তথ্য দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন যে, অন্যান্য রাজ্যে এই সমস্যা থাকলেও তারা টাকা পাচ্ছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বঞ্চিত হচ্ছে। অবশ্য, মুখ্যমন্ত্রীর এই অভিযোগকে খণ্ডন করতে সেই সময়েই “শেম-শেম” বলে চিৎকার করে ওঠেন বিজেপি বিধায়করা। তখন বিজেপি বিধায়কদের কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আগে কাউন্সিলর নির্বাচনে জিতে আসুন। আমাকে তো জোর করে হারানো হয়েছে। আমি জিতে দাঁড়িয়ে আছি।”
বিভিন্ন প্রকল্পে রাজ্যকে বঞ্চনার অভিযোগ নিয়ে ফের বিধানসভায় সরব হলেন মমতা। তিনি বলেন, “গত চার বছরে ১০০ দিনের কাজের টাকা আমাদের দেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় বরাদ্দ বন্ধ করা অপরাধ। আমাদের টাকা অন্য রাজ্যকে দেওয়া হয়েছে, যা অপরাধ। কিছু অভিযোগ থাকতেই পারে। ১৫৫-১৫৬টি টিম (কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল) এসেছিল। তারা যা জানতে চেয়েছিল, ব্যাখ্যা দিয়েছি। কিন্তু কোনও টাকা দেওয়া হয়নি।” মমতার বক্তব্য, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতেও অনেক অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনও কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল বা কমিশন পাঠানো হয় না। তিনি বলেন, “কাজ করালে টাকা দিতে হবে। এটা দস্তুর। আমাদের টিম দেখা করতে গিয়েছিল। তাদের সময় দিয়েও দেখা করেনি। উল্টে কেস করে দিয়েছে। কেন্দ্র টাকা দেয়নি, বাংলা টাকা দিয়েছে। ব্যক্তিগত ভাবে প্রত্যেককে কেস দিয়েছে। ওঁরা আমাদের টাকা দেবেন না। এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।” গত চার বছরে গ্রামীণ রাস্তা এবং আবাস প্রকল্পেও রাজ্যকে কোনও টাকা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ মমতার।
বালুরঘাটের বিজেপি বিধায়ক তথা অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ী রাজ্যকে আর্থিক বঞ্চনা প্রসঙ্গে তথ্য জানাতে চেয়েছিলেন। তার প্রেক্ষিতে মমতা বলেন, “আশা করি অর্থনীতি আপনি আমাদের থেকে ভাল বোঝেন। কিন্তু যে প্রশ্নটা আপনি করলেন, এটা আপনি বাজেটে বলতে পারতেন। আমার অর্থমন্ত্রী উত্তর দিতে পারতেন। এটা বাজেট এবং অর্থনীতি সংক্রান্ত প্রশ্ন। এই প্রশ্নের সঙ্গে আলোচনার কোনও যোগ নেই।” বাংলার জন্য বরাদ্দ টাকাকে কেন অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে, তা নিয়েও অশোককে প্রশ্ন করেন মমতা। তিনি বলেন, “বাংলাকে নিয়ে বঞ্চনার খেলা খেলবেন না। আমাদের প্রাপ্য আমরা পাই না, পাই না, পাই না।”

সাসপেন্ড বিজেপি বিধায়ক
এদিন মুলতুবি প্রস্তাব জমা দেন বিজেপির শিক্ষক সেলের বিধায়করা। প্রায় ২৬ হাজার চাকরিহারাদের ভবিষ্যৎ কী, তা নিয়ে আলোচনার দাবি করেন বিজেপি বিধায়করা। কিন্তু অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, আদালতের বিচারাধীন বিষয়ে বিধানসভায় আলোচনা সম্ভব হবে না। তাতেই চটে যান বিজেপি বিধায়করা। তাঁদের দাবি, এরকম বহু ইস্যু নিয়ে আগে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু এক্ষেত্রে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে কেন? এরপর ফের বিরোধিতা করে বিজেপি বিধায়করা স্লোগান দিতে শুরু করেন। বিক্ষোভের পর একদিনের জন্য সাসপেন্ড করা হয় কুমারগ্রামের বিজেপি বিধায়ক মনোজ ওরাওঁকে। প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেন বিজেপি বিধায়করা। ন্যায্য কিছু নিয়ে বলতে গেলেই সাসপেন্ড করা হচ্ছে, অভিযোগ করেন বিজেপি বিধায়করা।