ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে নতুন করে বিতর্কে জড়াল কেরালার সিপিএম সরকার। সম্প্রতি কেরালার চতুর্থ শ্রেণির সমাজবিদ্যার পাঠ্যপুস্তক এবং স্টেট কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (SCERT) প্রকাশিত শিক্ষকদের হ্যান্ডবুকে একাধিক ঐতিহাসিক তথ্য ভুল পাওয়া যায়।
সবচেয়ে বড় অভিযোগ, সেই বইতে লেখা হয়েছে যে নেতাজি ব্রিটিশদের ভয়ে জার্মানিতে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং হিটলারের আশ্রয়ে লুকিয়ে ছিলেন।
এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ইতিহাসবিদ থেকে সাধারণ মানুষ, সকলে একবাক্যে বলেন – নেতাজিকে কাপুরুষ হিসেবে দেখানো একটি চরম অপমান।
নেতাজি ও সিপিএমের পুরনো দ্বন্দ্ব
তবে ইতিহাসে নতুন কিছু নয় যে বাম দল ও নেতাজির মধ্যে সম্পর্ক বরাবরই বিতর্কিত। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র পিপলস ওয়ার-এ নেতাজিকে নিয়ে একাধিক ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময়কার সিপিএম নেতারা প্রকাশ্যে নেতাজিকে “তোজোর কুকুর” বলে কটাক্ষ করেছিলেন।
নেতাজি যখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনের ডাক দিচ্ছেন, তখন কমিউনিস্টরা ব্রিটিশপন্থী অবস্থান নিয়েছিল। ফলে নেতাজির সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ক্রমশ বেড়ে গিয়েছিল। তাই আজকের দিনে কেরালার পাঠ্যবইতে এমন মন্তব্য উঠে আসায় অনেকের মতে এটা সিপিএমের দীর্ঘদিনের মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
পাঠ্যবইয়ের একাধিক ভুল তথ্য
কেরালার চতুর্থ শ্রেণির সমাজবিদ্যার দ্বিতীয় অধ্যায় ভারত এন্তে রাজ্যম-এ একাধিক গুরুতর ভুল তথ্য পাওয়া গেছে –
বইতে লেখা হয়েছে সরোজিনী নাইডু ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম মহিলা সভাপতি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রথম মহিলা সভাপতি ছিলেন অ্যানি বেসান্ত। সরোজিনী নাইডু ছিলেন প্রথম ভারতীয় মহিলা সভাপতি।
আরেক জায়গায় লেখা হয়েছে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুই ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (INA) গঠন করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে INA প্রথম গঠন করেন ক্যাপ্টেন মোহন সিং, রাশবিহারী বসুর সহযোগিতায়। নেতাজি পরে সেনাটিকে পুনর্গঠন করে নেতৃত্ব দেন।
মানচিত্রে বড় ভুল: ভারতের মানচিত্রে অসম ও ঝাড়খণ্ডের নাম নেই, অথচ ছাত্রছাত্রীদের রাজ্যগুলির নাম খুঁজে বলতে বলা হয়েছে।
শিক্ষকরা এই ভুলগুলি দেখে প্রথমেই শিক্ষা দফতরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁদের মতে, প্রাথমিক স্তরে এই ধরনের তথ্যভ্রান্তি শিশুদের মনে দেশের ইতিহাস নিয়ে বিকৃত ধারণা তৈরি করবে।
শিক্ষকদের হ্যান্ডবুকের বিতর্কিত মন্তব্য
সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্যটি পাওয়া গেছে শিক্ষকদের হ্যান্ডবুকের ডিজিটাল খসড়ায়। সেখানে লেখা হয় –
“সুভাষচন্দ্র বসু ব্রিটিশদের ভয়ে জার্মানিতে পালিয়ে গিয়েছিলেন।”
এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই কেরালার শিক্ষা দফতর প্রবল চাপে পড়ে। দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, কারণ নেতাজির লড়াই, আত্মত্যাগ এবং সাহসকে অস্বীকার করে তাঁকে কাপুরুষ হিসেবে দেখানো ইতিহাস বিকৃত করার সামিল।
সরকারের সাফাই ও সংশোধনী
বিতর্ক চরমে উঠতেই কেরলের শিক্ষামন্ত্রী ভি শিবানকুট্টি জানান – “পাঠ্যবইয়ের খসড়ায় কিছু ঐতিহাসিক ভুল থেকে গিয়েছিল। বিষয়টি আমাদের নজরে আসতেই সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
SCERT দ্রুত বইটির সংশোধিত সংস্করণ অনলাইনে প্রকাশ করে। তবে সমস্যা হলো, মুদ্রিত কপি ইতিমধ্যেই ছাত্রছাত্রীদের হাতে পৌঁছে গিয়েছে। ফলে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে স্কুলে।
কেন এত গুরুতর এই বিতর্ক?
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসকে বিকৃত করা মানে শুধু একটা ভুল তথ্য নয়, বরং শিশুদের মনে ভুল ধারণা গেঁথে দেওয়া। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু শুধুমাত্র বাংলার নয়, গোটা ভারতের গর্ব। তাঁর সাহস, দূরদর্শিতা ও নেতৃত্ব আজও কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা।
তাঁকে ব্রিটিশদের ভয়ে পালিয়ে যাওয়া কাপুরুষ হিসেবে দেখানো শুধু অযৌক্তিকই নয়, বাঙালি তথা ভারতীয়দের গর্বে আঘাত।
কেরল সিপিএম সরকারের পাঠ্যবই বিতর্ক আবারও সামনে এনেছে এক জ্বলন্ত প্রশ্ন – আমরা কি সত্যিই শিশুদের ইতিহাস সঠিকভাবে শেখাতে পারছি? নাকি রাজনৈতিক মতাদর্শের ছায়ায় ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে?
CPM against Netaji – এই বিতর্ক প্রমাণ করে, ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা যতই করা হোক, সত্যকে ঢেকে রাখা যায় না। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম ইতিহাসে চিরকাল লেখা থাকবে সাহস, নেতৃত্ব এবং আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে।