সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
তোমাদের যারা পুর্ব পুরুষ, তারা ব্রিটিশের দালালি করেছিল আর মুচলেকা দিয়ে এসেছিল। কেরালার পাঠ্য বইতে লেখা হয়েছে নেতাজী না কি ইংরেজদের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল! বাংলা ভাষা বলে যদি কিছু নাই থাকে তাহলে জন গন মন বলে জাতীয় সংগীত গাও কি করে? এভাবেই আজ ধর্মতলায় তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের মঞ্চ থেকে বিজেপি এবং সিপিএমকে একযোগে আক্রমণ করার পাশাপাশি বাংলা ভাষায় এবং বাঙালি অস্মিতা নিয়ে সুর চড়ালেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভিন রাজ্যে বাংলার শ্রমিকদের হেনস্থা প্রসঙ্গে মমতা বলেন, আপনারা মানুষের অধিকার কেড়ে নেন। ক্ষমতা বিসর্জন দেন। বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে গরিব মানুষের উপর অত্যাচার করেন। গরিব মানুষ আমার হৃদয়, তাঁদের ভালোবাসি। আমি জাত-পাত মানি না।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ছাত্র জীবনের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, আমি যোগমায়া দেবী কলেজের ছাত্র পরিষদের ইউনিট প্রেসিডেন্ট ছিলাম। মেয়েদের মধ্যে বক্তৃতা দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। তাই সব জায়গায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হতো। এই কারণে দেশের বহু জায়গায় তিনি গিয়েছেন এবং তাই তাঁর চেয়ে দেশটাকে ভালো আর কেউ চেনে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মমতা বলেন, আমার মতো দেশটাকে এত কাছ থেকে কেউ বোঝে না। ২০১১ থেকে রাজ্যের আয় বেড়েছে সাড়ে পাঁচ গুণ। দারিদ্র্য দূরীকরণে আমাদের সরকার ইতিমধ্যেই কোটি কোটি মানুষকে সুবিধা দিয়েছে। ২ কোটি মানুষকে দারিদ্র সীমার উপরে নিয়ে এসেছে আমাদের এই সরকার। কন্যাশ্রী আজ বিশ্বের মডেল প্রকল্প। প্রায় এক কোটি ছাত্রী এর আওতায় এসেছে। সবুজ সাথী, তরুণের স্বপ্ন, স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড, শিক্ষাশ্রী, মেধাশ্রী— প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছাত্র-যুবকদের পাশে থেকেছে তৃণমূল। তিনি দাবি করেন, গত এক দশকে শিক্ষার পরিকাঠামোয় ৬৯ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। ৪ কোটি ৫০ লক্ষেরও বেশি পড়ুয়া পেয়েছে স্কলারশিপ।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সরকারের কন্যাশ্রী প্রকল্প নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমি গর্ব করে বলি আমার কন্যাশ্রী পৃথিবীর সেরা। তিনি জানান, এই প্রকল্পের তিনটি ধাপ রয়েছে, প্রথম ধাপ স্কুলের জন্য, দ্বিতীয় ধাপ কলেজের জন্য এবং তৃতীয় ধাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। তিনি আরও বলেন, সাধারণ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা যাতে সংরক্ষণের কারণে কোনো সমস্যায় না পড়ে, তার জন্য সরকার তাদের আর্থিক সাহায্যও দেয়।
বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশ কমানোর কৃতিত্বও দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকার ইতিমধ্যেই ২ কোটি বেকারকে চাকরি দিয়েছে। ১০০ দিনের কাজ থেকে শুরু করে গ্রামীণ আবাস যোজনায় এক নম্বরে ছিল বাংলা। বিরোধীদের কটাক্ষ করে তিনি বলেন, নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে যারা বড় বড় কথা বলে, তারাই ব্যাকডোর দিয়ে লড়াই করে উন্নয়ন আটকাচ্ছে। কিন্তু আমরা হারতে শিখিনি। ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হামলা, এজেন্সির দাপাদাপি, এনআরসি সহ একাধিক ইস্যুতে বিজেপিকে নিশানা করেন মমতা। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ তুলে বলেন, বাংলা সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে থেকেও কেন্দ্র টাকা আটকে দিচ্ছে। এনআরসি-র নাম করে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। বাংলাকে অসম্মান করতে টাকা দিয়ে সিনেমা বানানো হচ্ছে, ক্ষুদিরাম বসুকে ক্ষুদিরাম সিং বলা হচ্ছে। আমরা এসব চক্রান্তের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালাব। পরিবারতন্ত্র নিয়ে অমিত শাহকে খোঁচা দিয়ে তিনি বিজেপিকে ললিপপ সরকার আখ্যা দেন। পাশাপাশি ইঙ্গিত দেন, আগামী নির্বাচনে তৃণমূল আরও বেশি আসন পাবে। শেষে দলনেত্রী সাফ বার্তা দেন, বাংলার মানুষ বিজেপির জুলুম মেনে নেবে না। বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়বে না তৃণমূল কংগ্রেস।
এদিনের সভামঞ্চ থেকে নাম না করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও তীব্র আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমি অনেক প্রধানমন্ত্রী দেখেছি। আমাকে শিখিয়ে লাভ নেই। আমি এবার বই লিখব, কাকে কেমন দেখেছি। আপনাকে নিয়েও তো একটা লেখা থাকবে। সেলফিস জায়ান্টরা, যারা হাই লোডেড ভাইরাস, যাদের হিমোগ্লোবিন কম আছে, তারা ভাবছে এনআরসি চালু করে ভোটাধিকার কেড়ে নেবে। কিন্তু জেনে রাখুন জীবন থাকতে ভোটাধিকার কাড়তে দেব না। সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে বার্তা, বাচ্চারা ললিপপ খেলে মানায় , কিন্তু বড়রা ললিপপ খেলে মানায়। মুখ্যমন্ত্রীর সাফ কথা, হিংসা করে বাংলা আর পাঞ্জাবকে ভাগ করেছেন। তখন তো আমরা ছিলাম না, এর দায় আমরা নেব না।