সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতার রিয়েল এস্টেট জগতে চরম আলোড়ন ফেলে দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়। নয়ডার সুপারটেক টুইন টাওয়ার ভাঙার ঘটনার মতোই এবার কলকাতায়ও এক বহুতল ভাঙার নির্দেশ দিল আদালত।
হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, বেআইনি অনুমোদন, প্রতারণা এবং দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে ওঠা নিউ টাউনের ২৬ তলা টাওয়ারকে দুই মাসের মধ্যে ভেঙে ফেলতে হবে। এই রায়ের ফলে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে শহরের আবাসন শিল্প, প্রোমোটারদের ভূমিকা এবং সরকারি সংস্থার নজরদারির সীমাবদ্ধতা।
হাইকোর্টের রায়: বেআইনি বহুতল ভাঙার নির্দেশ
বিচারপতি রাজশেখর মান্থা এবং বিচারপতি অজয়কুমার গুপ্তর ডিভিশন বেঞ্চ তাদের ৯৪ পাতার রায়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন— প্রোমোটাররা প্রতারণা করে সংশোধিত অনুমোদন জোগাড় করেছিলেন।
NKDA আইন, পশ্চিমবঙ্গ অ্যাপার্টমেন্ট ওনারশিপ অ্যাক্ট এবং প্রোমোটার অ্যাক্ট-এর একাধিক ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে।
২০১৫ সালের ২০ আগস্টের অনুমোদন বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে।
এক মাসের মধ্যে ফ্ল্যাট মালিকদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে হবে এবং দুই মাসের মধ্যে টাওয়ার ভাঙতে হবে।
প্রোমোটাররা টাওয়ার না ভাঙলে NKDA সেই কাজ সম্পন্ন করবে এবং খরচ প্রোমোটারদের থেকেই আদায় করবে।
সমস্ত ফ্ল্যাট ক্রেতাদের টাকা ফেরত দিতে হবে ৭% সুদসহ।

অভিযুক্ত কারা?
প্রধান অভিযোগ উঠেছে এলিটা গার্ডেন ভিস্তা প্রাইভেট লিমিটেড-এর শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে।
সুশীল মোহতা – ম্যানেজিং ডিরেক্টর, মার্লিন গ্রুপের কর্ণধার ও ক্রেডাই বেঙ্গলের প্রেসিডেন্ট।
প্রকাশ বচ্চাওয়াত – ফুলটাইম ডিরেক্টর, জেবি গ্রুপ।
সহযোগী গোষ্ঠী – সুরেকা গ্রুপের প্রদীপ সুরেকা।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রোমোটাররা ‘অবৈধভাবে এবং গোপনে’ এই ২৬ তলা টাওয়ার নির্মাণ করেছেন, এবং এর ফলে ফ্ল্যাট ক্রেতা ও জমির মালিক উভয় পক্ষকেই প্রতারিত করা হয়েছে।
ফ্ল্যাট মালিকদের অভিযোগ ও লড়াই
২০০৭ সালে কেপেল ম্যাগাস প্রাইভেট লিমিটেড প্রথমে প্রকল্পের অনুমোদন নেয়। তখন পরিকল্পনা ছিল—
২৩ তলার ১৫টি টাওয়ার
১২৭৮টি ফ্ল্যাট
১৬৮৮টি গাড়ি পার্কিং
পর্যাপ্ত খোলা জায়গা ও কমিউনিটি সুবিধা
২০১০ সালে ফ্ল্যাট ক্রেতারা জমির অংশীদারিত্ব পান, ২০১২ সালে রেজিস্ট্রেশন হয়।
কিন্তু ২০১৪ সালে কেপেল সংস্থা মালিকানা বিক্রি করে দেয় এলিটা গার্ডেন ভিস্তা প্রাইভেট লিমিটেড-কে। নতুন মালিকরা ২০১৫ সালে সংশোধিত পরিকল্পনা নিয়ে ২৬ তলা নতুন টাওয়ার এবং একটি বাণিজ্যিক প্লাজা নির্মাণ শুরু করেন, যা ফ্ল্যাট মালিকদের অগোচরে ঘটে।
২০১৭ সালে মালিকরা জানতে পারেন—
টাওয়ার বেড়ে হয়েছে ১৬টি।
ফ্ল্যাট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৮৮-তে।
খোলা জায়গা ৬০০ বর্গমিটার পর্যন্ত কমে গেছে।
২০১৮ সালে তাঁরা লিখিতভাবে অভিযোগ জানান NKDA-কে। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ না হওয়ায় শেষমেশ তাঁরা হাইকোর্টে মামলা করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট মন্তব্য করেছে—
প্রোমোটারদের আচরণ ছিল প্রতারণামূলক ও বেআইনি।
১৫ টাওয়ারের ফ্ল্যাট মালিকরা যেমন প্রতারিত হয়েছেন, তেমনি ১৬তম টাওয়ারের মালিকরাও প্রতারিত হয়েছেন।
NKDA তাদের আইনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।
ডিভিশন বেঞ্চ আরও জানায়, রিয়েল এস্টেট শিল্পে এ ধরনের বেআইনি কার্যকলাপ নজিরবিহীন নয়। তাই এই রায় অন্য প্রোমোটারদের জন্যও সতর্কবার্তা।
আইনি লড়াই: প্রোমোটারের চেষ্টা ব্যর্থ
প্রোমোটারের আইনজীবী অভ্রজিৎ মিত্র আদালতের রায় স্থগিত রাখার আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু বেঞ্চ সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। অর্থাৎ, বহুতল ভাঙা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
প্রভাব: রিয়েল এস্টেট জগতে কাঁপন
এই রায়ের প্রভাব বহুমাত্রিক—
1. ফ্ল্যাট ক্রেতাদের জন্য বার্তা: আইন তাঁদের পাশে আছে। প্রতারণার শিকার হলে আদালত আশ্রয় হতে পারে।
2. প্রোমোটারদের জন্য সতর্কবার্তা: প্রতারণা বা দুর্নীতি করে কোনো প্রকল্প অনুমোদন নিলে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
3. সরকারি সংস্থার ভূমিকা: NKDA-র মতো সংস্থাগুলিকে ভবিষ্যতে আরও সতর্ক হতে হবে।
4. শহরের রিয়েল এস্টেট বাজারে আস্থা: একদিকে ভয় তৈরি হলেও অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলার দৃঢ়তা ক্রেতাদের ভরসা জোগাবে।

কলকাতা হাইকোর্টের এই রায় শুধু একটি বহুতল ভাঙার নির্দেশ নয়, বরং গোটা আবাসন শিল্পের জন্য একটি মাইলফলক। সুপারটেক টুইন টাওয়ারের মতো এই ঘটনাও বার্তা দিচ্ছে—আইনকে ফাঁকি দিয়ে, দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে বহুতল তৈরি করলে শেষ পর্যন্ত তা টিকবে না।
নিউ টাউনের ২৬ তলা টাওয়ার ভাঙার নির্দেশ শুধু কলকাতার নয়, গোটা দেশের আবাসন শিল্পের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হয়ে থাকবে।