নবীকরণযোগ্য শক্তি, জল সংরক্ষণ, প্লাস্টিকমুক্ত হোটেল ও ইভি চার্জিং— পরিবেশ রক্ষায় একের পর এক পদক্ষেপে জোর দেশের অন্যতম বৃহৎ আতিথেয়তা সংস্থা IHCL-এর
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: পরিবেশ রক্ষা আর কর্পোরেট দায়বদ্ধতা— এই দুইকে এক সুতোয় গেঁথে এবার বড় বার্তা দিল দেশের অন্যতম শীর্ষ আতিথেয়তা সংস্থা IHCL (Indian Hotels Company Limited)। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মঞ্চে সংস্থাটি তুলে ধরল তাদের উচ্চাভিলাষী ESG+ উদ্যোগ ‘পাথ্যা’ (Paathya)-র সাফল্য ও আগামী দিনের পরিকল্পনা। লক্ষ্য একটাই— পর্যটন ও আতিথেয়তা শিল্পের উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা।
পরিবেশ নিয়ে শুধু বক্তব্য নয়, বাস্তব কাজের পরিসংখ্যানও সামনে এনেছে IHCL। সংস্থার দাবি, ২০২৬ সাল পর্যন্ত তাদের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ৪১ শতাংশই আসছে নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎস থেকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ১৭১টি স্থানে ইতিমধ্যেই বসানো হয়েছে ৩৮৬টি ইভি চার্জিং স্টেশন।
শুধু তাই নয়, হোটেল পরিচালনার ক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে IHCL-এর অধীনে ১০৮টি জৈব বর্জ্য কম্পোস্টিং প্ল্যান্ট চালু রয়েছে। পাশাপাশি ৮৫টি ইন-হাউস জল বোতলজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, যার ফলে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের উপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
জল সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও সংস্থার উদ্যোগ নজর কেড়েছে। তাদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট বর্জ্যজলের ৫৪ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবেশের উপর চাপ কমছে, তেমনই জলের অপচয়ও রোধ করা সম্ভব হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে IHCL-এর এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (হিউম্যান রিসোর্সেস) গৌরব পোখরিয়াল বলেন, “পাথ্যা শুধুমাত্র একটি প্রকল্প নয়, এটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির অংশ। আমরা বিশ্বাস করি, আতিথেয়তা শিল্পের বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত দায়িত্ব একসঙ্গে চলতে পারে। নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, জল সংরক্ষণ এবং বৃত্তাকার অর্থনীতির ধারণাকে বাস্তবায়িত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, জল সংকট আগামী দশকের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই জল সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে IHCL। চলতি বছরের শুরুতে বিশ্ব জল দিবসে ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গুজরাট, তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকে জলাধার পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণ প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আগামী তিন বছরে এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে ৫০ লক্ষ ঘনমিটারেরও বেশি জল সংরক্ষণ বা পুনর্ভরণ সম্ভব হবে। শুধু পরিবেশ নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি ও স্থানীয় জীবিকাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
‘পাথ্যা’-র আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সার্কুলার অপারেশনস বা পুনর্ব্যবহারভিত্তিক পরিচালনা ব্যবস্থা। খাদ্য ও জৈব বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা, বর্জ্যজল পুনর্ব্যবহার, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং নিজস্ব বোতলজাত জল উৎপাদনের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে হোটেল শিল্পে পরিবেশবান্ধব সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
তবে এখানেই থেমে থাকতে রাজি নয় IHCL। সংস্থা ইতিমধ্যেই ২০৩০ সালের জন্য বেশ কিছু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তার মধ্যে রয়েছে— মোট শক্তির ৫০ শতাংশ নবীকরণযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহ, ১০০ শতাংশ বর্জ্যজল পুনর্ব্যবহার, প্রতিটি হোটেলে ইভি চার্জিং স্টেশন স্থাপন, সমস্ত হোটেলকে সিঙ্গল-ইউজ প্লাস্টিকমুক্ত করা এবং প্রতিটি ইউনিটে জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু করা।

পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে কর্পোরেট জগতের ভূমিকা নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন উঠছে, তখন IHCL-এর এই উদ্যোগ নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পর্যটন শিল্প কি সত্যিই পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের মডেল হয়ে উঠতে পারে? ‘পাথ্যা’-র সাফল্য সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
এখন দেখার, ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে IHCL কি দেশের আতিথেয়তা শিল্পে এক নতুন সবুজ মানদণ্ড তৈরি করতে পারে?