১৮ জুন বিধানসভার অধিবেশনের আগেই মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার তৎপরতা, ১১ জুন হাইকোর্টে গুরুত্বপূর্ণ শুনানি
সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিরোধী দলনেতা পদকে ঘিরে যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা এবার সরাসরি আদালতের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেল। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বীকৃতি নিয়ে নতুন করে জোরদার হল রাজনৈতিক টানাপোড়েন। স্পিকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করল তৃণমূল কংগ্রেস।
সোমবার তৃণমূলের পক্ষ থেকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেন। বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের এজলাসে দায়ের হওয়া এই মামলাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে। কারণ, আগামী ১৮ জুন থেকেই শুরু হতে চলেছে নতুন সরকারের প্রথম বিধানসভা অধিবেশন। তার আগেই বিরোধী দলনেতা পদ নিয়ে আইনি লড়াইয়ের নিষ্পত্তি চায় ঘাসফুল শিবির।
তৃণমূলের অভিযোগ, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও বিধানসভা-সংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। সেই কারণেই স্পিকারের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে দল।
ঘটনার সূত্রপাত বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই। নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়ার পর তৃণমূল নেতৃত্ব প্রথমে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। কিন্তু সেই ঘোষণার পরই দলের অন্দরমহলে শুরু হয় প্রবল বিতর্ক।
এরপর সামনে আসে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ। বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কয়েকজন বিধায়কের সই জাল করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি ঘিরে থানায় অভিযোগ দায়ের হয় এবং তদন্তের দায়িত্ব নেয় সিআইডি। সেই তদন্ত এখনও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহার নেতৃত্বে একদল বিক্ষুব্ধ বিধায়ক নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে শুরু করেন। তাঁদের দাবি ছিল, বিরোধী শিবিরের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক তাঁদের সঙ্গেই রয়েছেন। পরে প্রায় ৬০ জন বিধায়ক মিলে ‘নব তৃণমূল ব্লক’ গঠনের কথা ঘোষণা করেন।
শুধু তাই নয়, ওই গোষ্ঠীর বিধায়করা বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে লিখিতভাবে জানান যে তাঁরা বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করছেন। সেই চিঠির ভিত্তিতেই স্পিকার তাঁকে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দেন বলে জানা যায়।
কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে একেবারেই মেনে নিতে নারাজ তৃণমূল নেতৃত্ব। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিরোধী শিবিরের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, তা এখন শুধুমাত্র মর্যাদার প্রশ্ন নয়; আগামী দিনে বিধানসভার ভিতরে-বাইরে বিরোধী রাজনীতির দিকনির্দেশও অনেকটাই নির্ভর করবে এই পদের উপর।
তাই অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই আদালতের মাধ্যমে স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়ার চেষ্টা করছে তৃণমূল। দলের আশঙ্কা, যদি ঋতব্রত বিরোধী দলনেতা হিসেবে অধিবেশনে যোগ দেন, তাহলে রাজনৈতিক বার্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
এখন সব নজর ১১ জুনের দিকে। সেদিন হাইকোর্টে এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা। আদালত কি স্পিকারের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করবে? নাকি ঋতব্রতের বিরোধী দলনেতার মর্যাদা বহাল থাকবে?
রাজনৈতিক অন্দরে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—বিধানসভার অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই কি বদলে যাবে বিরোধী রাজনীতির সমীকরণ, নাকি আরও বড় সংঘাতের মঞ্চ তৈরি হচ্ছে বাংলার রাজনীতিতে?