সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার জেরা, ফের হাজিরার নোটিস, আর তার মাঝেই বিজেপি ও অমিত শাহকে নিশানা করে তীব্র আক্রমণ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ভুল তথ্য প্রচার হলে হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ারও হুঁশিয়ারি।
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতার রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের তীব্র চাঞ্চল্য। সিআইডির জেরা এবং নতুন করে হাজিরার নোটিসের মাঝেই বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় [Abhishek Banerjee CID Notice]। স্পষ্ট ভাষায় তিনি প্রশ্ন তুললেন, তাঁর বক্তব্যের জন্য যদি তদন্ত হতে পারে, তাহলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ [Amit Shah]–এর বিতর্কিত মন্তব্যের ক্ষেত্রেও একই আইন কেন প্রযোজ্য হবে না?
বৃহস্পতিবার কলকাতায় [Kolkata Politics] সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অভিষেক বলেন, তিনি কখনও তদন্ত এড়ানোর চেষ্টা করেননি। বরং নির্ধারিত সময়ের আগেই সিআইডি দফতরে পৌঁছে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছেন।
তাঁর দাবি, তদন্তে সবরকম সহযোগিতা করেছেন এবং আগামী ১৪ জুন ফের হাজিরার নির্দেশ পেলেও তিনি তা মেনে তদন্তকারী সংস্থার সামনে উপস্থিত হবেন।
তবে এখানেই থামেননি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তিনি অভিযোগ করেন, তদন্ত সংক্রান্ত একাধিক তথ্য সংবাদমাধ্যমে আগেভাগেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। কোন প্রশ্ন করা হচ্ছে, কী জবাব দেওয়া হচ্ছে—সেসব তথ্য বাইরে কীভাবে পৌঁছে যাচ্ছে, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
অভিষেকের কথায়, “আমি বাড়ি ফেরার আগেই প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় প্রশ্ন কী ছিল, তা বাইরে ঘুরছে। এই তথ্য কোথা থেকে বেরোচ্ছে, সেটাই তো বড় প্রশ্ন।”
এরপরই আসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক আক্রমণ। অভিষেক দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে যে নোটিস জারি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ জনসভায় করা একটি মন্তব্য। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি সরাসরি অমিত শাহকে নিশানা করেন।
তাঁর বক্তব্য, যদি তাঁর মন্তব্যের জন্য তদন্ত হয়, তাহলে তৃণমূল কর্মীদের নিয়ে অমিত শাহের করা বিতর্কিত মন্তব্যের ক্ষেত্রেও কেন একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে না? কেন এফআইআর দায়ের হয়নি? আইন কি সবার জন্য সমান নয়?
এই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি কার্যত কেন্দ্র ও বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তোলেন।
এদিকে বিজেপিকেও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন অভিষেক। তাঁর দাবি, ভোটের আগে একাধিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন মানুষের সামনে উঠে আসছে ‘বুলডোজার রাজনীতি’। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নেওয়ার পর অন্য পথে হাঁটলে মানুষ তার জবাব দেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তৃণমূল কংগ্রেস [Trinamool Congress] এখনও বাংলার বড় অংশের মানুষের সমর্থন পায় বলেও দাবি করেন অভিষেক। তাঁর কথায়, “ভয় দেখিয়ে, নোটিস পাঠিয়ে বা দলের অফিস দখল করে তৃণমূলকে দুর্বল করা যাবে না।”
সিআইডির একটি দল তাঁর বাড়িতে নোটিস দিতে গিয়েছিল বলেও জানান তিনি। তবে বৈঠকে থাকার কারণে তিনি নিজে উপস্থিত থাকতে পারেননি। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে তদন্তকারী সংস্থাকে আগে ফোনে জানিয়ে আসার অনুরোধও করেন।
অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের প্রতিও কড়া বার্তা দেন অভিষেক। তাঁর অভিযোগ, যাচাই না করেই নানা জল্পনা ও ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে আইনি পথে হাঁটার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, “গুজবকে সত্য হিসেবে পরিবেশন করা হলে আমরা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হব।”
রাহুল গান্ধী [Rahul Gandhi]–র সঙ্গে তাঁর বৈঠক নিয়ে সাম্প্রতিক জল্পনা সম্পর্কেও মুখ খোলেন অভিষেক। স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এ বিষয়ে তিনি বা রাহুল গান্ধী কেউই প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি। ফলে নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার কোনও ভিত্তি নেই বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

সব মিলিয়ে সিআইডি তদন্ত, অমিত শাহকে ঘিরে পাল্টা প্রশ্ন, সংবাদমাধ্যমকে আইনি সতর্কবার্তা এবং বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ—এক মঞ্চ থেকে একাধিক বার্তা দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজ্যের রাজনীতিতে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে, আর ১৪ জুনের হাজিরার পর নতুন করে কী বার্তা উঠে আসবে—সেই দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।