প্রিয়াঙ্কা মান্না। কলকাতা সারাদিন।
হিন্দু জীবনধারা অনুসারে, মুক্তি বা মোক্ষ না পাওয়া পর্যন্ত জীবন ও মৃত্যুর সংসার অন্তহীন। সৎকর্ম বা নির্বাণের মাধ্যমে অধরা মোক্ষ অর্জন না হওয়া পর্যন্ত জীবন জন্ম ও মৃত্যুর মাঝামাঝি চলে। কোনও জীবই ভাগ্যের হাত থেকে বাঁচতে পারে না।
তবুও, হিন্দু ধর্মে, আমরা এমন আটজন ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি হই যারা অমরত্বের আশীর্বাদপ্রাপ্ত বা অভিশপ্ত এবং এখনও আমাদের মধ্যে বেঁচে আছেন বলে জানা যায়।
হিন্দু পুরাণের ৮ চিরঞ্জীবী:
১. হনুমান। ২. পরশুরাম। ৩. মার্কণ্ডেয়। ৪. বিভীষণ। ৫. কৃপাচার্য। ৬. অশ্বত্থামা। ৭. মহাবলী। ৮. বেদব্যাস।
अश्वत्थामा बलिव्र्यासो हनूमांश्च विभीषण:। कृप: परशुरामश्च सप्तएतै चिरजीविन:॥ सप्तैतान् संस्मरेन्नित्यं मार्कण्डेयमथाष्टमम्। जीवेद्वर्षशतं सोपि सर्वव्याधिविवर्जित।।

হিন্দু শাস্ত্র ও পৌরাণিক কাহিনিতে এমন আটজনের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাঁরা এখনও জীবিত এবং কলিযুগের অন্তকাল পর্যন্ত এঁদের উপস্থিতি থাকবে। কথিত আছে যে, এই আট চিরঞ্জীবী কোনও না-কোনও প্রতিশ্রুতি, আশীর্বাদ ও অভিশাপের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এখনও বিচরণ করছেন। শাস্ত্র মতে এই অষ্ট চিরঞ্জীবী দিব্য শক্তিতে পরিপূর্ণ। আবার পুরাণে যে অষ্টসিদ্ধি সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে, তার সমস্ত শক্তি এই আট জনের মধ্যে নিহিত। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী অষ্ট চিরঞ্জীবী মন্ত্র জপ করলে একাধিক সুফল পাওয়া যায়।
অষ্ট চিরঞ্জীবীদের সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
পুরাণে যে অষ্ট চিরঞ্জীবীর উল্লেখ পাওয়া যায়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মহাভারতের মহাবীর অশ্বত্থামা। দ্রোণাচার্যের পুত্র অশ্বত্থামা অমর। কিন্তু এই অমরত্ব তাঁর কাছে আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ রূপে আসে। উত্তরার গর্ভের সন্তানকে বধ করার জন্য শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে কলিযুগেও নিজের পাপের ভার বহন করে যেতে হবে অশ্বত্থামাকে। মধ্যপ্রদেশের পাহাড়ি জঙ্গলে অনেকেই তাঁকে দেখেছেন বলে লোকমুখে প্রচলিত আছে।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় ছল করে দ্রোণাচার্যকে বধ করেন পাণ্ডবরা। অশ্বত্থামা নামে এক হাতিকে হত্যা করে রটিয়ে দেওয়া হয় যে অশ্বত্থামার মৃত্যু হয়েছে। সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরের কাছে প্রকৃত ঘটনা জানতে চান দ্রোণাচার্য। তখন যুধিষ্ঠির বলেন ‘অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ’। কিন্তু ‘ইতি গজ’ কথাটা যুধিষ্ঠির এতই আস্তে বলেন, যে শুধু ‘অশ্বত্থামা হত’ শুনে পুত্রশোকে কাতর দ্রোণাচার্য অস্ত্রত্যাগ করেন। তখন তাঁকে মুণ্ডচ্ছেদ করে বধ করেন ধৃষ্টদ্যুম্ন। তাঁর বাবাকে এই ভাবে ছলনা করে হত্যা করায় ক্রুদ্ধ অশ্বত্থামা প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন।
পাণ্ডবদের ধ্বংস করতে নারায়ণাস্ত্র নিয়ে তাঁদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন অশ্বত্থামা। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ সবাইকে রক্ষা করেন। যুদ্ধের অষ্টাদশ দিনে দুর্যোধনের উরুভঙ্গের পর পাণ্ডবদের বধ করার সংকল্প নিয়ে রাত্রিবেলা ঘুমের মধ্যে চুপিসাড়ে পাণ্ডব শিবিরে হানা দেন অশ্বত্থামা। কিন্তু পঞ্চপাণ্ডবের বদলে ভুল করে দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রকে হত্যা করেন তিনি।
এর পরেও অশ্বত্থামার রাগ শান্ত হয় না। পাঁচ পুত্রের হত্যার প্রতিশোধ নিতে অর্জুন ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করতে উদ্যত হন। পাল্টা ব্রহ্মাস্ত্র ছোঁড়েন অশ্বত্থামাও। দুই ব্রহ্মাস্ত্রের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে গোটা বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে, অর্জুনকে এই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁকে নিরস্ত করেন কৃষ্ণ। কিন্তু অশ্বত্থামা নিজের ব্রহ্মাস্ত্রকে না আটকে তার অভিমুখ বদলে দেন। ব্রহ্মাস্ত্রের প্রয়োগে গর্ভের মধ্যেই মৃত্যু হয় অভিমন্যুর স্ত্রী উত্তরার অনাগত সন্তানের।
গর্ভস্থ শিশুর হত্যা করে অশ্বত্থামা যে ভয়ানক পাপ করেন তার জন্য তাঁকে অভিশাপ দেন শ্রীকৃষ্ণ। অশ্বত্থামার কপালের মণি উপড়ে বের করে নেন কৃষ্ণ। কৃষ্ণ তাঁকে অভিশাপ দেন, যে মৃত্যুর কামনা করেও মৃত্যু পাবেন না অশ্বত্থামা। কলিযুগের অবসান না হওয়া পর্যন্ত এই পৃথিবীতেই থাকতে হবে তাঁকে। তাঁর পাপের ভার বইতে হাজার হাজার বছর ধরে নিঃসঙ্গ একাকী জীবন তাঁকে কাটাতে হবে। তাঁর ক্ষত শুকোবে না, এই ক্ষতই হবে তাঁর পাপের পরিচয়।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে সাতপুরা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত আসিরগড় কেল্লায় অশ্বত্থামা বাস করেন। এই কেল্লার শিবমন্দিরে প্রতিদিন তিনি শিবের পুজো করেন। রোজ সকালে এই মন্দিরে দেখা যায় টাটকা ফুল আর আবির শিবলঙ্গের কাছ রাখা। অনেক সময় জঙ্গল লাগোয়া গ্রামের বাসিন্দারা এক বিরাট লম্বা মানুষকে জঙ্গলের পথে দেখেছেন। আবার অনেকে জানিয়েছেন যে খুব ভোরে ঘরের দরজায় কড়া নেড়ে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ একটু হলুদ আর তেল চান তাঁদের কাছে। তাঁর কপালের ক্ষত থেকে রক্ত ঝরে পড়ে। ওই তেল আর হলুদ ক্ষতে লাগিয়ে তিনি কোথায় মিলিয়ে যান, আর কেউ দেখতে পায় না।
পুরাণ অনুসারে শ্রীকৃষ্ণের অষ্টম অবতার কল্কির জন্য অপেক্ষা করছেন অশ্বত্থামা। কল্কির আবির্ভাব হলে তাঁকে সাহায্য করবেন তিনি। কল্কিরূপী বিষ্ণুকে রক্ষা করে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্য করবেন অভিশপ্ত অশ্বত্থামা।
দৈত্যরাজ বলি মহাপ্রলয়ের পরেও জীবিত থাকবেন
দৈত্যরাজ বলি দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর প্রপৌত্র। হিরণ্যকশিপুর পুত্র বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদ এবং প্রহ্লাদের পুত্র বিরোচন। বিরোচনের পুত্র বলি। হিরণ্যকশিপুকে বিষ্ণু নৃসিংহ অবতার নিয়ে বধ করেছিলেন। হিরণ্যকশিপুর মৃত্যুর পরে তার পুত্র প্রহ্লাদকে সিংহাসনে বসিয়ে বিষ্ণু তাকে আশীর্বাদ করেন যে প্রহ্লাদের পরবর্তী চব্বিশ অধস্তন পুরুষকে বিষ্ণু রক্ষা করবেন। প্রহ্লাদের নাতি দৈত্যরাজ বলি রাজাসনে বসার পরে অশ্বমেধ যজ্ঞ করার সিদ্ধান্ত নেন।
তখন নিয়ম ছিল, কোনো রাজা সফলভাবে এক হাজার অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ম করলে তিনি দেবতাদের রাজা ইন্দ্র পদে অধিষ্ঠিত হবেন। তাই, কেউ অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করলেই যেকোনো প্রকারে ইন্দ্র তাতে বাধা দিতেন। বলিকে যজ্ঞ করা থেকে বিরত করতে বিষ্ণু আবার একটি অবতার ধরেন। ব্রাহ্মণবেশে বামন অবতারে তিনি বলির যজ্ঞে গিয়ে উপস্থিত হন। ব্রাহ্মণদের উপহার দেওয়ার পালা শুরু হলে বামন বলির কাছে তিন পা রাখার মতো জমির আবদার করেন।
ধার্মিক বলি খুশিমনে তা দিতে রাজি হন। তারপর বামন বিশাল আকার ধারণ করে এক পা স্বর্গে, এক পা পৃথিবীতে রেখে বলির কাছে তৃতীয় পা রাখার জায়গা চাইলে বলি নিজের মাথা পেতে দেন। বলির একাগ্রতা ও ভক্তিতে বিষ্ণু সন্তুষ্ট হয়ে বলিকে পাতালের রাজত্ব দান করেন। পাতাল থেকে বছরে একদিন পৃথিবীতে এসে নিজের প্রজাদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখার বর দেন। সবশেষে বলিকে অমরত্ব দান করেন ভগবান বিষ্ণু এবং এই কল্পের পরের কল্পে দেবতাদের রাজা ইন্দ্র পদে তাকে অধিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। দক্ষিণ ভারতের কেরালায় বলির পৃথিবীতে আগমনের দিনটিতে ওনাম উৎসব পালন করা হয়।
৩. বেদব্যাসের অমরত্ব
মহর্ষি বেদব্যাসের পুরো নাম কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস। তিনি বেদকে চারভাগে ভাগ করেছিলেন বলে এর নাম হয় বেদব্যাস। ইনি মহাভারত ও শ্রীমদভগবত গীতার রচয়িতা। মহর্ষি পরাশর বেদব্যাসের পিতা এবং রামের কূলগুরু বশিষ্ঠ মুনি পিতামহ। বেদব্যাসের মা সত্যবতী, যাকে হস্তিনাপুরের রাজা শান্তনু বিয়ে করেছিলেন। বেদব্যাস পুরো ভরতবংশীয়দের কাহিনী এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কাহিনী মহাভারতে বর্ণিত করেন।
কথিত আছে, তিনিই গণেশকে দিয়ে মহাভারত লিখিয়েছিলেন। গণেশ সন্তুষ্ট হয়ে তাকে দীর্ঘায়ুর বর দেন। মহর্ষি ব্যাস বুদ্ধি ও জ্ঞানের প্রতীক। ভগবান বিষ্ণুও তাকে চিরঞ্জীবের বর দিয়েছিলেন।
৪. পবনপুত্র হনুমানের অমরত্বপ্রাপ্তি
হনুমানকে বলা হয় শিবের অবতার। বানররাজ কেশরীর ঔরসে রানী অঞ্জনার গর্ভে হনুমান জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হনুমানের জন্মে বায়ুদেবতার ভূমিকা থাকায় এবং বায়ুদেবতার বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় তাকে পবনপুত্রও বলা হয়। হনুমান জগতে রামভক্ত হিসেবে বিখ্যাত। লঙ্কা থেকে সীতার খোঁজ নিয়ে আসা, লেজে আগুন নিয়ে পুরো লঙ্কা জ্বালিয়ে দেওয়া, লক্ষ্মণের জন্য জড়িবুটি নিয়ে আসা, পাতালে রাবণের ভাই অহিরাবণের বন্দীত্ব থেকে রাম-লক্ষ্মণকে উদ্ধার করা ছাড়াও পুরাণ ও রামায়ণে হনুমানের অনেক ভূমিকার কথা বর্ণিত রয়েছে।
হনুমান বাল-ব্রহ্মচারী। অর্থাৎ, সংসারধর্ম পালন করেননি তিনি। হনুমান তার চাঞ্চল্য ও গতির জন্য প্রসিদ্ধ। মহাভারতে একবার হনুমানের উপস্থিতি দেখা যায়। ভীমকে যুদ্ধকলা শেখানোর উদ্দেশ্যে তিনি হাজির হয়েছিলেন। ত্রেতাযুগে জন্মানো হনুমান একাগ্রভাবে রামভক্তির কারণে রাম ও সীতা কর্তৃক অমর হওয়ার বর প্রাপ্ত হন। যেখানেই রামনাম করা হবে বা রামভক্তি প্রকটিত হবে, হনুমান সেখানেই গিয়ে বাস করবেন।
৫. বিভীষণও রামের বরে অমরত্ব পেয়েছিলেন
বাংলা তথা আধুনিক ভারতীয় সাহিত্যে বিভীষণকে বিশ্বাসঘাতক বলেই উল্লেখ করা হয়। কিন্তু রামায়ণে বিভীষণকে একজন ধার্মিক রাজা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভীষণ রামশিবিরে যোগ না দিলে রাবণকে হারানো খুব কঠিন হতো রামের পক্ষে। রাবণকে বধ করার পরে শ্রীরাম বিভীষণকে লঙ্কার রাজা ঘোষিত করেন। রাজা হয়ে বিভীষণ লঙ্কার প্রজাদের মাঝে ধর্মপ্রচারে ব্রতী হন। অসুরপ্রবৃত্তি থেকে সরিয়ে এনে ধর্মে মতি করেন লঙ্কার রাক্ষসদের।
বিভীষণ সপরিবারে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। পত্নী সরমা ও কন্যা ত্রিজাতাকে সাথে নিয়ে তিনি লঙ্কার প্রজাদের প্রভূত কল্যাণ সাধন করেছিলেন। বিভীষণের ধার্মিকতা ও সততায় প্রসন্ন হয়ে রাম লঙ্কাত্যাগের পূর্বে তাকে অমরত্বের বর দান করেন। অমর হওয়ার পাশাপাশি তার কাঁধে কিছু দায়িত্বও প্রদান করেন। বিভীষণকে শ্রীরাম পৃথিবীতে অবস্থান করে সত্য, সুন্দর ও ধার্মিকতা পালন করতে তথা প্রচার করতে নির্দেশ দেন।
৬. কৃপাচার্য অমর হয়েছিলেন কৃষ্ণের বরে
মহাভারতে যে কয়জন মহান গুরুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তন্মধ্যে কৃপ অন্যতম। তিনি গুরু দ্রোণাচার্যের শ্যালক ও অশ্বত্থামার মামা। ‘কৃপ’ অর্থ তীরের ডগা। মহাভারতে কৃপের জন্মের ব্যাপারে বলা হয়েছে, কৃপ ও তার বোন কৃপীর জন্ম হয়েছিল তীরের ডগা থেকে। পরিণত বয়সে কৃপীর সাথে দ্রোণের বিয়ে দিয়ে কৃপ কুরুবংশের গুরুর দায়িত্ব নেন। ধার্মিক হওয়া সত্ত্বেও শুধু গুরুধর্ম পালনের জন্য কৃপাচার্য কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষাবলম্বন করেন।
যুদ্ধ শেষে কৌরবপক্ষীয় যে তিনজন মহারথী বেঁচেছিলেন, তাদের মধ্যে কৃপাচার্য একজন। বাকি দুজন হলেন কৃতবর্মা ও অশ্বত্থামা। কৃষ্ণ পরীক্ষিতকে বাঁচানোর পরে কৃপের হাতে তার বিদ্যাশিক্ষার ভার দেন। কৃপ পরীক্ষিতকে শিক্ষিত করেন। দ্বারকার অন্ত হওয়ার পূর্বে শ্রীকৃষ্ণ কৃপাচার্যকে অমরত্বের আশীর্বাদ দিয়ে বলেন, শুধু দ্বাপরযুগেই নয় কলিযুগেও আপনাকে গুরুধর্ম পালন করতে হবে। কল্কি অবতারকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার দায়িত্ব আপনার।
৭. পরশুরামের চিরঞ্জীবিতা
পরশুরামকে বলা হয় বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার। পরশুরাম, রাম, কৃষ্ণ– এ অবতারগুলোকে বলা হয় আবেশ অবতার। কূর্ম বা নৃসিংহের মতো অবতারগুলোতে বিষ্ণু সরাসরি কোনো প্রাণী বা সত্ত্বার রূপ ধারণ করে অবতারিত হয়েছেন। কিন্তু আবেশ অবতারগুলোতে বিষ্ণু মানুষের দেহে পরমাত্মা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। পুরাণানুযায়ী, মানুষরূপে ভগবান অবতারিত হলে তাকে বলা হয় আবেশ অবতার। পরশুরাম ঋষি জমদগ্নির ঔরসে, মা রেণুকার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি জন্মগতভাবে ব্রাহ্মণ হলেও প্রবৃত্তিতে ছিলেন ক্ষত্রিয়। এজন্য তাকে বলা হয় ‘ব্রাহ্ম-ক্ষত্রিয়’।
পরশুরাম শিবের কাছে শিক্ষালাভ করেন। শিব সন্তুষ্ট হয়ে তাকে একটি কুড়াল বা পরশু উপহার দিয়েছিলেন বলে তার নাম ‘রাম’ থেকে পরশুরাম হয়। ক্ষত্রিয় রাজা কার্তবীর্যার্জুন অন্যায়ভাবে তার বাবা জমদগ্নিকে হত্যা করে তাদের গরু কামধেনুকে চুরি করে নিয়ে গেলে পরশুরাম কুটিরে এসে দেখেন, তার মা বুক চাপড়ে আহাজারি করছেন। একুশবার বুক চাপড়ানোর জন্য পরশুরাম পৃথিবীকে একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। অন্যায়কারী ও আততায়ী ক্ষত্রিয়দের তিনি বধ করেন। তিনিও অমরত্ব লাভ করেছেন কলিযুগের শেষে কল্কিকে যুদ্ধকলায় পারদর্শী করার জন্য। পরশুরাম হবেন কল্কির প্রধান গুরু।
৮. বালক ঋষি মার্কণ্ডেয়
অন্যান্য চিরঞ্জীবীগণের চেয়ে মার্কণ্ডেয় ঋষির গল্পটি একটু আলাদা। মার্কণ্ডেয়র পিতার নাম মৃকান্ডু ও মাতার নাম মারুদমতি। মৃকাণ্ডুর সন্তান তাই মার্কণ্ডেয়। মার্কণ্ডেয় ছিলেন ভৃগুবংশজাত। তিনি একাধারে শিব ও বিষ্ণুর পরমভক্ত ছিলেন, যা সচরাচর দেখা যায় না পুরাণে। মৃকান্ডু ঋষিপত্নীকে নিয়ে পুত্রলাভের বাঞ্ছায় একবার শিবের তপস্যা শুরু করেন। শিব এসে তাদের দুটো বরের ভেতর একটি পছন্দ করতে বলেন। প্রথমটি হলো, সন্তান হবে বিচক্ষণ ও মহাধার্মিক; কিন্তু আয়ু হবে একদম কম। দ্বিতীয়টি হলো, সন্তান হবে স্থূলবুদ্ধি তবে দীর্ঘায়ু। মৃকান্ডু ও তার পত্নী প্রথমটি বেছে নেন। যথাসময়ে তাদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়।
সন্তানের আয়ু হবে পূর্বনির্ধারিত- ষোলো বছর। এটি জানার পরে মার্কণ্ডেয় শিবের তপস্যা শুরু করেন। বালক ঋষি তপস্যায় এতই লীন হতেন যে শিবলিঙ্গ জড়িয়ে ধরে জপ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়তেন। মার্কণ্ডেয়র মৃত্যুর সময় হলে যমদূতরা এসে তার সামনে হাজির হয়। কিন্তু তার তপের প্রভাবে যমদূতেরা তার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারে না। শেষে স্বয়ং যমরাজ মহিষে চড়ে সে স্থলে হাজির হন। তিনি তার ধর্মপাশ, যেটি কারো উপর পড়লে মৃত্যু অবধারিত- তা মার্কণ্ডেয়র উপর ফেলতে গিয়ে ভুলক্রমে শিবলিঙ্গে ফেলেন। শিব এতে প্রচণ্ড ক্ষেপে যান। ভক্তকে রক্ষার জন্য স্বয়ং এসে হাজির হন। যমের দিকে ত্রিশূল উঁচিয়ে ধরলে যম ভয় পেয়ে যান। মার্কণ্ডেয়কে দীর্ঘায়ুর বর দিয়ে তাড়াতাড়ি স্থানত্যাগ করেন যমরাজ। মহাদেবও মার্কণ্ডেয়কে আশীর্বাদ করেন। মার্কণ্ডেয়র নামে একটি পুরাণই প্রচলিত আছে- ‘মার্কণ্ডেয়পুরাণ’ নামে।
আট চিরঞ্জীবী বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেবতার বরে অমরত্ব লাভ করলেও একটি জায়গায় তারা এক। প্রত্যেকেই কল্কি অবতারের সাথে সংযুক্ত। পুরাণ বলছে, এরা সবাই কল্কিকে শিক্ষিত, সংগঠিত ও শক্তিমান করতে ভূমিকা পালন করবেন। মহাপ্রলয়ের সাথে অমৃতপানকারী দেবতাদের যেমন অন্ত হবে, তেমনই তারাও প্রাণত্যাগ করবেন। মহাপ্রলয়ে সবকিছু, সব প্রাণ ধ্বংস হলেও বেঁচে থাকেন শুধু তিনজন। যাদের পুরাণে বলা হয় ত্রিমূর্তি। পরের পর্বে বলা হবে ত্রিমূর্তির গল্প।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: বিভিন্ন পুরাণভেদে এসব কাহিনীতে মতান্তর রয়েছে, তাই অমিল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যায়। এই লেখাতে সর্বাধিক প্রচলিত কাহিনীই রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
Astha Chiranjeevi : The Eight Immortals of Hindu Dharma