‘আগের সরকারের আমলে ১০ লক্ষ পুরুষ বেরিয়েছে, মহিলাদের এই টাকা কি পুরুষদের পাওয়া উচিত ছিল? লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা কেন পুরুষরা পাবে?’ অন্নপূর্ণা যোজনার চেক তুলে দিয়ে বিষ্ফোরক শুভেন্দু
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
‘দুই কোটির মধ্যে আগের সরকারের আমলে ১০ লক্ষ পুরুষ বেরিয়েছে। মহিলাদের এই টাকা কি পুরুষদের পাওয়া উচিত ছিল? লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা কেন পুরুষরা পাবে?’ বুধবার কলকাতায় নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে কলকাতা হাওড়া হুগলি এবং দুই ২৪ পরগনার অন্নপূর্ণা যোজনার উপভোক্তাদের হাতে প্রতীকি চেক তুলে দেওয়ার অনুষ্ঠানে এভাবেই বিগত সরকারের দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
বুধবার নেতাজি ইন্ডোরে অন্নপূর্ণা যোজনার অনুদান দেওয়ার কর্মসূচি ছিল। সেখানে ডিবিটির মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৩৪ লক্ষের বেশি মহিলার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হল। আজ, বুধবার সারাদিনের মধ্যে প্রত্যেক যোগ্য আবেদনকারীর অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকে যাবে বলে জানানো হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘২৬ লক্ষ আবেদন বাতিল করা হয়েছে। তাঁরা যোগ্যতা পূরণ করতে পারেনি। সরকারি টাকা যোগ্য আবেদনকারীরাই পাবেন। আমরা চাই না কোনও অযোগ্য এই প্রকল্পের সুবিধা পান।’ উপস্থিত উপভোক্তাদের মুখ্যমন্ত্রী জিজ্ঞাসা করেন, ‘এইটা কি ভুল?’ স্টেডিয়াম থেকে উত্তর আসে ‘না।
রাজ্যের মহিলাদের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে চালু হওয়া ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র আনুষ্ঠানিক সূচনা হল বুধবার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে। সেই মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট বার্তা দিলেন, ‘এটা কোনও ব্যক্তি বা দলের টাকা নয়, এটা সরকারের টাকা। ফলে উপযুক্ত মানুষই এই সুবিধা পাবেন, এটাই আমরা বিশ্বাস করি।’ রাজ্য সরকারের দাবি, ইতিমধ্যেই ১ কোটি ৬০ লক্ষেরও বেশি মহিলা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র জন্য ফ্যামিলি লেভেল ডেটা কালেকশন ফর্ম জমা দিয়েছেন। সেই সমস্ত তথ্য পোর্টালে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ঝাড়াই বাছাইয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল ভেরিফিকেশনও সম্পন্ন হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রথমে প্রায় ২৭ লক্ষ আবেদনপত্রের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। পরে দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের পর ১ কোটি ৬০ লক্ষ আবেদনকারীর তথ্য আপলোড করা হয়।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, ওই ১ কোটি ৬০ লক্ষ আবেদনকারীর মধ্যে ২৬ লক্ষ আবেদন বাতিল করা হয়েছে। বাকি প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষের মধ্যে যাচাই করে বুধবার দুপুর ১টা থেকে ১ কোটি ৯ লক্ষ ৯২ হাজার ৩৭৮ জনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো শুরু হয়েছে। পাহাড়ি এলাকার ১ লক্ষ ২২ হাজার ৬২৮ জন মহিলাও এই প্রকল্পের আওতায় টাকা পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করে জানান, বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী হিসেবে আসা এবং সিএএ-তে আবেদন করা ব্যক্তিরা, কিংবা যাঁদের নাম ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে, তাঁদের আবেদন চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই ভাতা বন্ধ করা হবে না। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রসঙ্গ টেনে পূর্বতন তৃণমূল সরকারকেও আক্রমণ করে শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ক্ষেত্রে ২৭ লক্ষ এমন নাম পাওয়া গিয়েছিল, যারা ভারতীয় নন। আবার কেউ কেউ এখানে থাকেন না, কারও তিন জায়গায় নাম ছিল। এমনকি ১০ লক্ষ পুরুষের অ্যাকাউন্টেও টাকা গিয়েছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা কি পুরুষদের অ্যাকাউন্টে যাওয়া উচিত? মাত্র দেড় মাসের সরকার। প্রধানমন্ত্রী যে গ্যারান্টি দিয়েছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের দিকেই আমরা অনেকটা এগিয়ে গিয়েছি।’ সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদও জানান তিনি।
অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম ফিলআপ-এর সময় অফলাইনের ক্ষেত্রে ১২ পাতার একটি ফর্ম ফিলআপ করতে হয়েছিল আবেদনকারীদের। সেই ১২ পৃষ্ঠার ফর্ম নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। বিষয়টি যে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘১২ পাতার ফর্ম নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু আসলে ৪টি পৃষ্ঠাই ফিলআপ করার দরকার ছিল। আর একবার যখন এই ফর্ম ফিলআপ করে দিলেন, পোর্টালে সব তথ্য আপলোড হয়ে গিয়েছে, এবার শুধু এই স্কিম না। ভারত সরকার-পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অসংখ্য স্কিমে এবার আপনারা সুবিধা পাবে। আর ফর্ম ফিলআপ করতে হবে না।’

মহিলাদের জন্য পিঙ্ক কার্ড
এবারের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির সংকল্প পত্র অনুযায়ী গত মাসের প্রথম দিন থেকেই সরকারি সমস্ত বাসের মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াত চালু করেছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। বুধবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মঞ্চ থেকে তিনি জানান, মহিলাদের জন্য খুব শীঘ্রই চালু করা হবে বিশেষ ‘পিঙ্ক কার্ড’। এই কার্ডের মাধ্যমেই সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধা পাবেন রাজ্যের মহিলারা। একইসঙ্গে যাঁরা নিজের খরচে বাসভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে চান, তাঁদের প্রতিও বিশেষ সম্মান জানান মুখ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি বাসে ইতিমধ্যেই ‘শূন্য মূল্যের টিকিট’ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। তাঁর দাবি, অনেক মহিলা এই সুবিধা নিতে চান না। কারণ তাঁরা নিজের উপার্জনে যাতায়াত করতে স্বচ্ছন্দ। সেই সমস্ত মহিলাদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যাঁরা বলছেন তাঁরা পর্যাপ্ত বেতন পান এবং বিনামূল্যের টিকিট নিতে চান না, তাঁদের আমি নতমস্তকে প্রণাম জানাই।’ তবে যাঁদের এই পরিষেবার প্রয়োজন, তাঁদের জন্যই রাজ্য সরকার ‘পিঙ্ক কার্ড’ চালু করতে চলেছে বলে জানান তিনি।
‘এত আমরা-ওরা রাজনীতি করার কী দরকার ছিল?’
বুধবার ডাক্তার দিবস উপলক্ষে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রথমে সকালে স্বাস্থ্য ভবনে চিকিৎসকদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হাজির হন। চারজন কৃতি চিকিৎসককে সংবর্ধনা জানিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এবং পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল-সহ স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের কাজের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘হায়দরাবাদ, চন্ডিগঢ়, মুম্বই যেখানেই যাবেন দেখবেন শুধু বাঙালি আর দরিদ্র। এত আমরা ওরা এত রাজনীতি করার কী দরকার ছিল। বাংলার মেধা শুধু দেশের নয় বিশ্বের যেকোনও দেশকে টেক্কা দিতে পারে। বাংলার মেধাবী ডাক্তার ভিন দেশে রাজত্ব করছে আর এই রাজ্যের মানুষ ভিন রাজ্যে হাসপাতালে লাইন দিচ্ছে। অন্য রাজ্যের মানুষের কাছে আছে আয়ুষ্মান কার্ড আর এরাজ্যের মানুষ হাজার হাজার টাকা বিল মেটাচ্ছে। এটা কি কাম্য ছিল বাংলায়। কি অবস্থা হাসপাতালগুলোর, স্বাস্থ্য ভবনের, মেডিক্যাল কলেজের। বেহাল অবস্থার হাল ফেরাতে হলে আগে স্বাস্থ্য ঠিক করতে হবে। এই দের মাসের মধ্যে আয়ুষ্মান ভারত এর মৌ স্বাক্ষর হয়েছে।’