১৫০ বছরের ঐতিহ্য ফের জাগিয়ে তুলতে নতুন রোডম্যাপ! আধুনিক ট্রাম, নতুন রুট, যানজট কমানোর পরিকল্পনায় বড়সড় উদ্যোগ সরকারের
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: যে ট্রাম একসময় কলকাতার পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক ছিল, সেই ট্রামই কি আবার ফিরতে চলেছে শহরের মূল স্রোতে? প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখ থেকে ফিরে আসার পর এবার ট্রাম পরিষেবাকে নতুনভাবে সাজানোর ইঙ্গিত দিল রাজ্য সরকার। পরিবহণ মন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে নতুন করে জোর চর্চা শুরু হয়েছে প্রশাসনিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
শুধু পুরনো ট্র্যাক বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং কলকাতার ট্রাম পরিষেবাকে আধুনিক রূপ দিয়ে আরও বিস্তৃত এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে। ফলে বহুদিন পর ট্রামপ্রেমীদের মনে আবারও আশার আলো জ্বলেছে।
পরিবহণ মন্ত্রী অর্জুন সিং (Arjun Singh Transport Minister) জানিয়েছেন, ট্রাম শুধুমাত্র একটি গণপরিবহণ ব্যবস্থা নয়, এটি কলকাতার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর কথায়, শহরের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেই আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে ট্রামকে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, শিল্পের পুনর্জাগরণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং শহরের যানজট কমানো—এই তিনটি লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ট্রাম পরিষেবাকে নতুনভাবে সাজানোর ভাবনা চলছে। পাশাপাশি পর্যটনের ক্ষেত্রেও ট্রামকে বড় আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, এই প্রকল্পের সম্ভাব্য রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে RITES (Rail India Technical and Economic Service)-কে। সংস্থাটি কলকাতার বর্তমান ট্রাম নেটওয়ার্ক, ভবিষ্যতের প্রয়োজন এবং প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে একটি বিস্তারিত ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করবে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সম্ভাব্য নতুন রুট সম্প্রসারণের পরিকল্পনা। সূত্রের খবর, দক্ষিণেশ্বর (Dakshineswar) থেকে কালীঘাট (Kalighat) এবং সল্টলেক (Salt Lake) থেকে নিউটাউন (New Town) পর্যন্ত ট্রাম পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা নিয়ে সমীক্ষা করা হচ্ছে। যদিও এখনও কোনও রুট চূড়ান্ত হয়নি, তবুও এই প্রস্তাব ঘিরে ইতিমধ্যেই শহরজুড়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
শুধু রুট বাড়ালেই হবে না, ট্রামের চেহারাও বদলাতে চায় সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন প্রজন্মের আধুনিক ট্রাম, উন্নত বগি, আরামদায়ক যাত্রা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবা চালুর বিষয়েও ভাবনা চলছে। একই সঙ্গে উন্নত সিগন্যালিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রাম চলাচল এবং অন্যান্য যানবাহনের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করে যানজট কমানোর লক্ষ্যও রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে কলকাতা ট্রাম (Kolkata Tram) পরিষেবা কার্যত বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই সময় বিষয়টি আদালতে পৌঁছায় এবং কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)-এর হস্তক্ষেপে ট্রামের অস্তিত্ব টিকে যায়। এরপর থেকেই ট্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা চলছিল।
এবার সরকারের তরফে পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত মিলতেই সেই আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পরিবেশবান্ধব গণপরিবহণ হিসেবে ট্রামের গুরুত্ব আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে শহরের ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।


তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—ঘোষণা কি বাস্তবের রেলপথে গড়াবে? দক্ষিণেশ্বর থেকে নিউটাউন পর্যন্ত সত্যিই কি একদিন ট্রামের ঘণ্টা বাজবে? এখন নজর RITES-এর রিপোর্ট এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কলকাতার ট্রাম কি সত্যিই নতুন যুগে প্রবেশ করতে চলেছে? সেই উত্তরই এখন অপেক্ষার।