মিৎসুবিশি, লাক্স ইন্ডাস্ট্রিজের পর এবার ফ্লিপকার্ট— একের পর এক শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠকে জোরালো হচ্ছে বিনিয়োগের জল্পনা, কর্মসংস্থানের আশা বাড়ছে রাজ্যে।
সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: বাংলার শিল্প মানচিত্রে কি সত্যিই বদলের হাওয়া বইতে শুরু করেছে? একের পর এক বড় কর্পোরেট সংস্থার সঙ্গে বৈঠক ঘিরে সেই প্রশ্নই এখন রাজ্য রাজনীতির পাশাপাশি শিল্পমহলেও আলোচনার কেন্দ্রে। বুধবার নবান্নে (Nabanna) দেশের অন্যতম শীর্ষ ই-কমার্স সংস্থা ফ্লিপকার্ট (Flipkart)-এর শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। বৈঠকের পর থেকেই জোরালো হয়েছে রাজ্যে নতুন বিনিয়োগ, ডিজিটাল বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা।
নবান্ন সূত্রে খবর, বৈঠকে মূলত ই-কমার্স (E-commerce), আধুনিক লজিস্টিকস, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন, গুদাম পরিকাঠামো এবং ভবিষ্যতের বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন দিকও উঠে এসেছে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ফ্লিপকার্টের (Flipkart) সিইও কল্যাণ কৃষ্ণমূর্তি (Kalyan Krishnamurthy), চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার রজনীশ কুমার (Rajnish Kumar)-সহ সংস্থার একাধিক শীর্ষ আধিকারিক। সরকারের তরফেও শিল্প ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের আগে শিল্প, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানকে সামনে রেখে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এবার সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকেই ধাপে ধাপে এগোতে চাইছে রাজ্য সরকার। যদিও এই বৈঠক থেকে কোনও নির্দিষ্ট বিনিয়োগের অঙ্ক বা প্রকল্প ঘোষণা করা হয়নি, তবুও শিল্পমহল বিষয়টিকে ইতিবাচক বার্তা হিসেবেই দেখছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গত কয়েকদিনে বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক এবং বিনিয়োগের খবর সামনে এসেছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে মিৎসুবিশি (Mitsubishi)-র সম্ভাব্য সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্প।
মুখ্যমন্ত্রী এর আগেই জানিয়েছিলেন, জাপানের এই বহুজাতিক সংস্থা পশ্চিমবঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর (Semiconductor) কারখানা তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। প্রাথমিক সমীক্ষার কাজও শেষ হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রে জানা যায়। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে পানাগড় (Panagarh) এবং ডানকুনি (Dankuni)—এই দুই এলাকাকে সম্ভাব্য শিল্পস্থল হিসেবে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সূত্রের দাবি, শুধু সেমিকন্ডাক্টর নয়, আরও কয়েকটি শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। চলতি মাসের মধ্যেই মিৎসুবিশি (Mitsubishi)-র প্রতিনিধিদল পশ্চিমবঙ্গে এসে সম্ভাব্য জমি পরিদর্শন করতে পারে। তার পরেই প্রকল্প নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।
অন্যদিকে, ইতিমধ্যেই লাক্স ইন্ডাস্ট্রিজ (Lux Industries) বাংলায় ৬০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের ঘোষণা করেছে। ডানকুনি (Dankuni)-তে প্রায় ১২ লক্ষ বর্গফুট এলাকাজুড়ে সংস্থার দ্বিতীয় উৎপাদন ইউনিটের সম্প্রসারণের কাজের সূচনা হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শিল্প সম্প্রসারণের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সেই মঞ্চ থেকেই রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় (Tapas Roy) শিল্পায়ন নিয়ে আশাবাদী বার্তা দেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলায় দীর্ঘদিনের শিল্প স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন করে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রয়োজনে শিল্পপতিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে আরও বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করবে সরকার। লক্ষ্য একটাই—রাজ্যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য নিজ রাজ্যেই কাজের সুযোগ তৈরি করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ই-কমার্স খাত শুধুমাত্র অনলাইন কেনাকাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বড় গুদাম, কোল্ড চেইন, ডেলিভারি নেটওয়ার্ক, পরিবহণ, প্যাকেজিং, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাকে যুক্ত করে এই খাত বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফলে ফ্লিপকার্ট (Flipkart)-এর মতো সংস্থার সঙ্গে সরকারের আলোচনা ভবিষ্যতের শিল্পনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
তবে বিরোধীদের একাংশের দাবি, শুধু বৈঠক নয়, বাস্তবে কতটা বিনিয়োগ আসে এবং কত কর্মসংস্থান তৈরি হয়, সেটাই হবে আসল পরীক্ষার বিষয়। রাজনৈতিকভাবে এই শিল্প-বিনিয়োগের বার্তা আগামী দিনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জোর চর্চা।

এখন নজর একটাই—নবান্নের এই ধারাবাহিক বৈঠক কি সত্যিই বাংলায় নতুন শিল্পায়নের দরজা খুলে দেবে, নাকি সবকিছুই থেকে যাবে আলোচনার টেবিলেই? সেই উত্তরই হয়তো আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।