মাত্র চার মাস আগে একসঙ্গে থাকতে শুরু করেছিলেন দু’জন। এখন একজনের মৃত্যু, অন্যজন হাসপাতালে। আত্মহত্যা, নাকি অন্য কোনও অপরাধ? তদন্তে নেমে সব দিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
রাহুল সিংহ মজুমদার। কলকাতা সারাদিন।
নিউটাউন (New Town)-এর একটি আবাসনের ফ্ল্যাটে ঘটে যাওয়া রহস্যজনক ঘটনাকে ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ২৫ বছরের তরুণী ও নেটপ্রভাবী তৃষা সাহা (Trisha Saha)-র ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই ঘর থেকে গুরুতর জখম অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে তাঁর লিভ-ইন সঙ্গী সৌভিক রায় (Souvik Roy)-কে। এই ঘটনায় আত্মহত্যা, খুন নাকি অন্য কোনও অপরাধ—সব সম্ভাবনাই খোলা রেখে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর (Barrackpore)-এর বাসিন্দা তৃষা এবং নৈহাটি (Naihati)-র বাসিন্দা সৌভিক একটি বেসরকারি সংস্থায় একসঙ্গে কাজ করতেন। সেখান থেকেই পরিচয়, তারপর প্রেম। কয়েক মাস আগে তাঁরা নিউটাউনের চণ্ডীবেড়িয়া (Chandiberia, New Town) এলাকার একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন।
রবিবার রাতেই আচমকা পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। বাড়ির মালিকের দাবি, তাঁর কাছে ফোন করে জানানো হয় তৃষা আত্মহত্যা করেছেন এবং পুলিশে খবর দিতে হবে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনি দেখেন, ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। বহুবার ডাকাডাকি ও ফোন করার পর অবশেষে ভিতর থেকে দরজা খোলা হয়। ঘরে ঢুকেই তিনি দেখেন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। এরপরই খবর যায় পুলিশের কাছে।
পুলিশ এসে তৃষার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে। একই সঙ্গে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় সৌভিককে। তাঁর হাতের শিরা কাটা ছিল বলে জানা গিয়েছে। দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। বর্তমানে তাঁর চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকদের অনুমতি মিললেই তাঁর বয়ান রেকর্ড করা হবে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী দল।
তদন্তে উঠে এসেছে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। পুলিশ সূত্রের দাবি, তৃষার শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে না আসা পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছেন না তদন্তকারীরা। তাঁকে মারধরের পর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
অন্যদিকে সৌভিকের হাতে যে গভীর ক্ষত রয়েছে, তা কীভাবে তৈরি হল, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। দু’জনের মধ্যে ধস্তাধস্তির জেরে এই আঘাত, নাকি তিনি নিজেই নিজেকে আঘাত করেছেন—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরাও ঘটনাস্থল থেকে একাধিক নমুনা সংগ্রহ করেছেন।
বাড়ির মালিক জানিয়েছেন, গত চার মাস ধরে ওই ফ্ল্যাটে থাকলেও কোনও দিন তাঁদের মধ্যে উচ্চস্বরে ঝগড়া বা অশান্তির শব্দ তিনি শোনেননি। বাইরে থেকে তাঁদের সম্পর্ক স্বাভাবিক বলেই মনে হত। সেই কারণেই এই ঘটনায় তিনি নিজেও বিস্মিত।
তদন্তকারীদের মতে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন এই ঘটনার নেপথ্যে থাকতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়নি। তাই আত্মহত্যার তত্ত্বে ভরসা না করে সমস্ত সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তৃষার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলবেন তদন্তকারীরা। পাশাপাশি মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড, চ্যাট হিস্ট্রি এবং ডিজিটাল তথ্যও পরীক্ষা করা হবে।
এই ঘটনায় এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য। সোশ্যাল মিডিয়াতেও তৃষার মৃত্যুকে ঘিরে নানা জল্পনা শুরু হলেও, পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে যে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সম্ভাবনাকেই চূড়ান্ত বলে ধরা যাবে না।

এখন সকলের নজর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ফরেন্সিক বিশ্লেষণ এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সৌভিকের বয়ানের দিকে। সেই তথ্যই জানিয়ে দিতে পারে, নিউটাউনের এই ফ্ল্যাটে ঠিক কী ঘটেছিল সেই রাতে। রহস্যের জট কবে খুলবে, আর সামনে আসবে কোন নতুন তথ্য—এখন সেই অপেক্ষাতেই গোটা শহর।