রাহুল সিংহ মজুমদার। কলকাতা সারাদিন।
শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার সোনারপুরে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা। সোনারপুর ও বিদ্যাধরপুর স্টেশনের মাঝের ঘটনা।
বৃহস্পতিবার সকালে, ১০টা ৫৮ মিনিটে ক্যানিং লোকাল (Local Train Accident) ট্রেনটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, যার ফলে প্রায় ৪০ মিনিট ধরে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
এই দুর্ঘটনার পেছনে ছিল এক যুবক, যিনি ট্রেন লাইনে বাইক ফেলে চম্পট দেন। তার অমন হঠাৎ সিদ্ধান্ত রেলপথে একটি মারাত্মক বিপর্যয় তৈরি করে, যা ক্যানিং লোকাল ট্রেন চলাচল ব্যাহত করে দেয়।
ক্যানিং লোকাল ট্রেন (Local Train Accident) দক্ষিণ ২৪ পরগণার ক্যানিং শহর থেকে কলকাতা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে যাত্রী পরিবহন করে থাকে। এটি দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন সার্ভিস হিসেবে পরিচিত।
এই রেলপথে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী চলাচল করে, বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা, ব্যবসায়ীরা এবং অফিসগামী কর্মীরা। ক্যানিং লোকাল রেলপথে এর আগে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটলেও এই ধরনের একটি দুর্ঘটনা এতটা ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলবে তা প্রত্যাশিত ছিল না।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৫৮ মিনিটে, ক্যানিং লোকাল ট্রেনটি যাত্রা শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যে একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। সূত্রের খবর অনুযায়ী, এক যুবক বাইক নিয়ে ট্রেন লাইনে চলে আসে এবং বাইকটি ট্রেন রুটে ফেলে চলে যায়। সেই বাইকটি ট্রেনের গতির সঙ্গে সংঘর্ষ হয়।
ট্রেনের চালক এক মুহূর্তেই বাইকটিকে দেখতে পান এবং তিনি খুব দ্রুত ব্রেক চাপতে সক্ষম হন, কিন্তু ট্রেনটি তখনও কিছুটা আগিয়ে গিয়েছিল।
বাইকটি ধাক্কা খেয়ে ট্রেনের সামনে পড়ে গেলে, ট্রেনের চালক সঠিক সময়ে ব্রেক চাপতে সক্ষম হলেও ট্রেনটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে প্রায় ৪০ মিনিট ধরে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। এই ঘটনায় সমস্ত রেলযাত্রীদের মধ্যে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। যারা নিয়মিত ক্যানিং লোকাল ব্যবহার করেন তারা জানেন যে, এই রুটে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হলে তাদের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
দুর্ঘটনার পর তদন্তে জানা যায় যে, ওই যুবক বাইক নিয়ে রেললাইনে চলে আসেন এবং বাইকটি ফেলে দ্রুত সটকে পড়েন। তবে এখন পর্যন্ত এই যুবকের পরিচয় জানা যায়নি, এবং তার পেছনের উদ্দেশ্যও স্পষ্ট নয়। অনেকেই মনে করছেন যে, এটি একটি দুষ্টুমি বা আত্মহত্যার চেষ্টা হতে পারে, তবে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ এখনও নিশ্চিত কিছু জানাতে পারেনি।
রেল পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে খবর,এক যুবক সোনারপুরের মথুরাপুর ভ্যান স্ট্যান্ডের কাছে রেল লাইন পারাপার করছিলেন। সেই সময় বিদ্যাধরপুর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল ডাউন ক্যানিং লোকাল। প্ল্যাটফর্ম ছাড়ার সময় হর্ন দেয় ট্রেন। তারপর ধীরে ধীরে সোনারপুর ছেড়ে ক্যানিংয়ের দিকে যাওয়ার জন্য এগিয়ে আসছিল।
এবার, আচমকাই ট্রেন আসতে দেখে কার্যত ঘাবড়ে যান যুবক। রেল ট্র্যাকের উপর নিজের বাইক ফেলে দিয়ে পালিয়ে যান তিনি। চলন্ত ট্রেন এসে ধাক্কা মারে বাইকে। এই ঘটনায় প্রায় চল্লিশ মিনিট ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় ক্যানিং শাখায়। ইন্দ্রজিৎ দাস নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, "দু'টো ছেলে রেললাইন পারপার করছিল। হঠাৎ দেখে ট্রেন সামনে চলে এসেছে। সঙ্গে-সঙ্গে তাঁরা বাইক ফেলে পালিয়ে যায়। ব্রেক দিয়ে ট্রেন থামানোর চেষ্টা করেছিলেন হয়ত লোকো পাইলট। কিন্তু পারেননি। ঘষতে-ঘষতে অনেকটা নিয়ে চলে যায়।"
এর আগে এই ধরনের দুর্ঘটনা বেশ কয়েকবার ঘটেছে, যেখানে কিশোর বা যুবকেরা রেলপথে বসে কিংবা রেললাইন পার হয়ে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে। রেলপথের সংলগ্ন এলাকাগুলোর মধ্যে বেশ কিছু জায়গায় অবৈধভাবে বাইক চালানো বা ট্রেন চলাচলের পথে এসে বসে থাকার ঘটনা ঘটেছে। এটি একটি গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যা, যার ফলে রেল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই দুর্ঘটনার পর ট্রেন চলাচল প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এই দীর্ঘ সময় ধরে ট্রেন বন্ধ থাকার ফলে হাজার হাজার যাত্রী তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। কলকাতা এবং আশপাশের এলাকায় কর্মরত বহু মানুষ ওই সময় ক্যানিং লোকাল ব্যবহার করছিলেন। বেশ কিছু অফিসগামী যাত্রীদের জন্য এই দীর্ঘ অপেক্ষা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য চরম দুর্ভোগে পড়েন।
এই দুর্ঘটনার পর ক্যানিং লোকালের যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সঠিক সময়ে সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। একজন যাত্রী বলেন, "আমরা প্রতিদিন এই রেলপথে যাতায়াত করি, কিন্তু এমন দুর্ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। তবে এই ধরনের পরিস্থিতি যাতে আর না ঘটে, তার জন্য কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।"
আরেক যাত্রী বলেন, "এই ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়তো অসাবধানতা বা অন্য কিছু হতে পারে, কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষের উচিত আরও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে আমাদের যাত্রায় কোনো ধরনের বিপর্যয় না হয়।"

রেল দুর্ঘটনা রোধে সুরক্ষা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে হবে। ট্রেন লাইনে সঠিক সতর্কতা এবং নিয়মিত পরিদর্শন চালানো অত্যন্ত জরুরি। ট্রেন চলাচলের আগে সঠিক রেলপথের নিরাপত্তা পরিদর্শন, জনসচেতনতামূলক প্রচার এবং অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে আরও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।