সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
কাশ্মীরের পেহেলগাঁওতে নিরীহ ভারতীয় পর্যটকদের ওপরে জঙ্গি হামলার পর থেকে টগবগ করে ফুটছিল গোটা দেশ। মঙ্গলবার গভীর রাতে গোটা দেশ যখন ঘুমিয়ে ঠিক তখনই অ্যাকশনে নামে ভারতীয় সেনা। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী-সহ বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন অমিত শাহ। ‘অপারেশন সিঁদুরের’ পর এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, জয় হিন্দ, জয় ভারত।
এই বৈঠকের পরেই মমতা বলেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে আজ বৈঠক হয়েছে।…আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, ভয় না পেয়ে ঠান্ডা মাথায় সবটা আগলে রাখা। যেহেতু অনেকগুলি রাজ্য সীমান্ত এলাকায়, তাই সবাইকে একসঙ্গে ভালো করে চলতে হবে। শান্তিরক্ষা করতে হবে।”
এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যবাসীকে বিভ্রান্ত না হয়ে শান্ত থাকার বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জানালেন, দায়িত্বপ্রাপ্তরা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশের সুরক্ষায় কেন্দ্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করবে রাজ্য। তাঁর বার্তা, “আতঙ্কিত হবেন না। বিভ্রান্ত হবেন না। দায়িত্বপ্রাপ্তরা নজর রাখছেন। কোনও তথ্য থাকলে জানাতে পারেন। মেসেজ করতে পারেন।” একইসঙ্গে ভুয়ো তথ্য বা খবর থেকে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন মমতা। বলেন, “সোশাল মিডিয়ায় ভুয়ো খবর ছড়াচ্ছে। ভুয়ো খবরে কান দেবেন না। যারা মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বিভিন্ন সময় কেন্দ্র-রাজ্যের মতপার্থক্য় সামনে এসেছে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থে রাজ্য সরকার সবসময় কেন্দ্রের পাশে রয়েছে বলে আগেই জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এবার বললেন,”কেন্দ্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ রেখে লড়াই করব। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এককাট্টা লড়াই। এই সময়ে কোনও বিভেদ নেই। আমরা সবাই দেশের পক্ষে।” সাধারণ মানুষের উদ্দেশে মমতার বার্তা, “আমরা দেশকে ভালোবাসি। বাংলা দেশের জন্য চিরকাল প্রাণ দিয়েছে। সবটা আগলে রাখুন।”
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আজ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠক করেছেন। আমরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করব। এই সময়ে আমাদের মধ্যে যেন কোনও বিভেদ না থাকে। সবার সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে, প্যানিক হওয়ার কারণ নেই। কারও আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। এটা দেশকে রক্ষা করার সময়। জরুরি পরিস্থিতিতে ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পুলিশ, এসপি, ডিএম, বিডিও সকলকেই সতর্ক করা হয়েছে। মোবিলিটি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ভিজিলেন্সও বাড়ানো হয়েছে। এখন সমস্ত ছুটি বাতিল করা হয়েছে।”
পাশাপাশি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে গরমের ছুটি এগিয়ে আনার কথা বলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “আমাদের স্কুলগুলিতে (সরকারি ও সরকার পোষিত) সম্ভবত গরমের ছুটি পড়ে গিয়েছে। আমরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলিকে রিকোয়েস্ট করব, এজন্য গাইডলাইন পাঠাচ্ছি না, এটা আমাদের আবেদন থাকবে। আমরা তো রাজ্য সরকারের স্কুলগুলিতে ছুটি দিয়ে দিয়েছি। যেহেতু অনেক রাজ্যেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাইভেট স্কুল যারা আছেন তারা যদি দয়া করে অনুগ্রহ করে আপনারা আপনাদের ছুটিটা যদি রবীন্দ্র জয়ন্তী থেকে করে দেন তাহলে ভালো হয়। বাচ্চারা বাড়িতে থাকলেই ভালো। বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করুক। আপনাদের তো ছুটি হবে। কেউ আট দশদিন বাদে হবে। পাঁচদিন বাদে। কেউ সাত দিন বাদে হবে।”
তবে তিনি কোনও ক্ষেত্রেই আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। কোথাও যাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও ভুল তথ্য, উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানো না হয়, বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো না হয় সেব্যাপারেও বিভিন্ন মহল থেকে আবেদন করা হয়েছে। মমতা বলেন, “আতঙ্ক ছড়াবেন না। সব খবর যে বিশ্বাস করতে হবে এমন কোনও মানে নেই। যারা বিভ্রান্তিমূলক, প্ররোচনামূলক খবর ছড়াবে…তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়ার জন্য গাইডলাইন কিন্তু আসছে।..এটা দেশকে রক্ষার সময়। যারা লড়াই করছে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা আমাদের দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে আমরা সবাই পালন করব। আপনারা নিজে থেকে কখনও বলবেন না এই জায়গায় আক্রান্ত হতে পারে, এটা আপনার দেখার ব্যাপার নয়, আপনাদের দেখার ব্যাপার নয়। বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষ আছেন, তারা নজর রাখবেন। আপনাদের কাছে কোনও তথ্য থাকলে আমরা একটা নম্বর দেব, সেই নম্বরে মেসেজ পাঠাতে পারেন। ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকছে। নর্থ বেঙ্গলেও করতে বলা হয়েছে। পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছে। ডিএম, এসপিকে সতর্ক করা হয়েছে। আইসি-রা, বিডিও-রা নজরদারি রাখবেন।”
এমন পরিস্থিতির সুযোগ নেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। পণ্য মজুত করে কালোবাজারি শুরু করে। তাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়। রাজ্যে যাতে এমন অবস্থা তৈরি না হয়, আমজনতা যাতে কালোবাজারির ফাঁদে না পড়ে, তাই আগামিকাল, বৃহস্পতিবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ নিয়ে তিনি বলেন, “যাতে দাম বাড়াতে না পারেন ব্যবসায়ীরা, সেদিকে নজর রাখতে হবে। এক্ষেত্রে সকলের দায়িত্ব আছে।” সবমিলিয়ে অস্থির পরিস্থিতিতে প্রকৃত অভিভাবকের মতোই রাজ্যবাসীর পাশে দাঁড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী।