সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
বছর ঘুরলেই বাংলায় ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন। তার আগেই বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোটের জামামা বাজিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কলকাতা নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামের সভা থেকে অমিত শাহ মমতাকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন বিধানসভায় শুভেন্দু কে দেখলেই পা কাঁপতে শুরু করে মমতা দিদির। অমিত শাহের সেই মন্তব্য যে নিছক কথার কথা ছিল না তা এবারে আরো একবার প্রমাণিত হলো বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে। চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আরও একবার ছুটে আসছেন বাংলা সফরে। আর এবারের নরেন্দ্র মোদির গন্তব্য শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রাম।
বিজেপি-র দাবি মেনে ২০ জুন তারিখকে রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিবস তথা ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ বলে মানতে নারাজ রাজ্য সরকার। এবারে ওই তারিখে নন্দীগ্রামে প্রধানমন্ত্রী জনসভা করতে পারেন বলে রাজ্য বিজেপির অন্দরে জল্পনা তুঙ্গে। ১৯৪৭ সালে বঙ্গভাগের সিদ্ধান্তকে স্মরণ করে ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকার ২০ জুন তারিখকে রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিবস তথা ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালনের নির্দেশ দিয়েছিল। গত কয়েক বছর ধরে দিনটি বিজেপি-র কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে। নন্দীগ্রাম বিজেপির কাছে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন করে জোরালো রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছেন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিজেপি ২০ জুনকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস ঘোষণা করার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি এই দিনটি বাঙালির জন্য ‘কালো দিন’ বলে মন্তব্য করেন। কারণ এটি বঙ্গবিভাজনের স্মৃতি বহন করে।
চলতি মাসের ২০ জুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নন্দীগ্রামে জনসভা করতে পারেন বলে রাজ্য বিজেপির অন্দরে তুমুল জল্পনা চলছে। মে মাসে আলিপুরদুয়ারে জনসভার পর এবার নন্দীগ্রামে মোদীর সম্ভাব্য সফর বাংলার রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
নন্দীগ্রাম, যা তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেখানে মোদীর জনসভা বিজেপির বাংলার মসনদ দখলের প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করতে পারে। তবে, তৃণমূল এই সফরকে তেমন গুরুত্ব দিতে নারাজ।
বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে এই সফরকে দেখা হচ্ছে, যা আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। নন্দীগ্রামের ইতিহাস রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর, এবং এখানে মোদীর উপস্থিতি তৃণমূলের শক্তির কেন্দ্রে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে। বিজেপির নেতারা মনে করছেন, মোদীর জনপ্রিয়তা এবং কেন্দ্রের উন্নয়ন প্রকল্পের প্রচার এই সভার মাধ্যমে বাংলার জনগণের কাছে পৌঁছে যাবে। অন্যদিকে, তৃণমূলের নেতারা এই সফরকে ‘রাজনৈতিক নাটক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এই সফর কীভাবে বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণকে প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে সবার দৃষ্টি এখন নন্দীগ্রামের দিকে।
শনিবার ঈদের দিনে চেতলা মসজিদে নামাজ শেষ করে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে ফের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আক্রমণ করলেন রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। গত মাসের শেষে বাংলা সফরে এসেছিলেন মোদী। চলতি মাসের ২০ তারিখেও ফের বঙ্গ সফরে আসার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ফিরহাদ বলেন, “ভোট এলেই ওরা বাংলায় ডেইলি প্যাসেঞ্জারি শুরু করে। এবারেও সেটা শুরু করছে। তবে আগের বারের ২০০ পারের ডাকের মতো এবারও বাংলার মানুষ ওদের পগারপার করে দেবে।”
অপারেশন সিঁদুর ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে রাজনীতি করার অভিযোগ এনেছেন ফিরহাদ। তিনি বলেন, “গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল। সেনাবাহিনী লড়াই করল, এখানে প্রধানমন্ত্রীর কোনও কৃতিত্ব নেই, বরং উনি একটা বড় দেশের ভয়ে কাপুরুষের মতো সেনাবাহিনীকে আটকে দিয়েছেন। আবার রাজ্যে ঘুরে ঘুরে সেনার সাফল্য নিয়ে রাজনীতি করছেন।”
ফিরহাদ হাকিম তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় সম্প্রীতির উপরও জোর দেন এবং বিজেপি-র বিরুদ্ধে “হিন্দুত্বের প্রসঙ্গ তুলে ভোট’ করার অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, “আমরা সকল ধর্মের সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করি। প্রকৃত হিন্দুরা অন্যের ধর্মকে সেভাবেই সম্মান করে। তাই হিন্দুত্বের প্রসঙ্গ তুলে ভোট হয় না।” নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি মসজিদে প্রার্থনা করি, আমাদের দুর্গাপুজো তার পাশেই অনুষ্ঠিত হয়। এটি আমাদের সকল ধর্মের সম্প্রীতির হিন্দুস্তান। এটি বাংলা। এখানে কোনও বিভেদ ও শাসন নেই। এটি শ্রীচৈতন্যদেবের স্থান। যেখানে আমরা সবাই একসঙ্গে ভালবাসা ভাগ করে নিই। কোনও ঘৃণা নেই।”