সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
“বাংলা ভাষার ওপর বিরাট সন্ত্রাস চলছে, ওরা বলছে বাংলা ভাষায় কথা বলা যাবে না, কে মাছ খাবে, ডিম খাবে ওরা ঠিক করে দিচ্ছে। বাংলা এসব মানবে না, সব মানুষের অধিকার এখানে সুরক্ষিত করা হবে। বাংলা ভাষার উপর সন্ত্রাস চলছে কেন? বাংলা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে। নবজাগরণ হয়েছে বাংলা থেকেই। বাংলার মাটি দুর্বৃত্তদের হবে না। বাংলার মানুষকে যদি বাংলা বলার জন্য বাইরে গ্রেফতার করা হয় এই লড়াই কিন্তু দিল্লিতে হবে। আমি কিন্তু ছাড়ার লোক নেই। মনে আছে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কথা? ২৭ জুলাই নানুর দিবস থেকে প্রতি শনি ও রবিবার বাংলা ভাষার উপর আক্রমণের প্রতিবাদে মিটিং-মিছিল করুন। প্রতিবাদে নামুন। এ বার শুরু হল ভাষারক্ষার শপথ।” এভাবেই একুশে জুলাই তৃণমূলের বাৎসরিক শহীদ দিবসের মঞ্চ থেকে বাংলার মানুষের আবেগকে জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি আগামী বছর অর্থাৎ 2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সুর বেঁধে দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সম্প্রতি বিহারে ভোটার তালিকা সংশোধন শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। যার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে তালিকা থেকে। এই ইস্যুতে বিজেপি সরকারকে আক্রমণ শানিয়ে মমতা বলেন, “একটা নোটিফিকেশন লুকিয়ে বানিয়ে বিজেপি শাসিত রাজ্যে পাঠিয়ে বলা হয়েছে যাকেই সন্দেহ হবে, বাংলায় কথা বলে, তাঁকে অ্যারেস্ট করবে, ডিটেনশন ক্যাম্পে রেখে দেবে এক মাস।”
এরপরই অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কেন্দ্রকে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। বারবার অনুপ্রবেশের দায় বাংলার সরকারের উপর চাপানোর চেষ্টা করেছে বিজেপি। “সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে বিএসএফ। যারা কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন। তাহলে সেখান থেকে যদি কেউ অনুপ্রবেশ করে তাহলে তার দায় কীভাবে রাজ্য সরকারের হয়? যদি অনুপ্রবেশ হয়ে থাকে, তবে সেটা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনে থাকা বিএসএফের ব্যর্থতার জন্য”, বলেন মমতা।

বাংলায় নাকি ১৭ লক্ষ রোহিঙ্গা!
দীর্ঘদিন ধরে এই বাংলার বিজেপি নেতাদের বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, বঙ্গে নাকি বাস করছে ১৭ লক্ষ রোহিঙ্গা! সোমবার একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে বিজেপির এই কুৎসারই সপাট জবাব দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর প্রশ্ন, “বিজেপির এক নেতা বলছে, বাংলায় নাকি ১৭ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে। সারা পৃথিবীতে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা কত? ইউএন বলছে দশ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে। কোথায় পেলেন ১৭ লক্ষ?”
কখনও নিয়োগ দুর্নীতি, কখনও চাকরিহারা, কখনও আর জি কর কাণ্ডের প্রতিবাদ, নানা ইস্যু নিয়ে কখনও কালীঘাট কখনও নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছে বিরোধী থেকে একাধিক প্রতিবাদ মঞ্চ। এদিন একুশের মঞ্চ থেকে সেই ইস্যু নিয়েই সুর চড়ালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাল্টা কর্মীদের কী করতে হবে সেই বার্তাও দিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কথায় কথায় আমার বাড়ির সামনে যাওয়া? কথায় কথায় নবান্ন অভিযান? তাহলে কথায় কথায় আপনাদের নেতাদের বাড়িতে অভিযান নয় কেন? আমরা তো এগুলো করিনি। আমি আগে বলেছিলাম বদলা নয়, বদল চাই। তাই আপনাদের গায়ে হাত দেয়নি। এবারের স্লোগান হবে জব্দ হবে, স্তব্ধ হবে।”
মমতার অভিযোগ, বাংলা বললেই রোহিঙ্গা বলে দেগে দেওয়ার চেষ্টা করছে কেন্দ্র সরকার। ভিনরাজ্যে বাংলাভাষীদের ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হচ্ছে। অন্তত হাজারখানেক বাঙালিকে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। মমতা বলেন, “বাংলার বাড়ি বন্ধ করে দিয়েছেন, গ্রামের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছেন। বাংলা ভাষায় কথা বললেই আপনাদের কী সমস্যা। বাংলা ভাষায় কথা বললেই আপনারা ভয় পেয়ে যান। বাংলা ভাষার ওপর বিরাট সন্ত্রাস চলবে, বাংলা ভাষায় কথা বলা যাবে না, কে মাছ খাবে ডিম খাবে ওরা ঠিক করে দিচ্ছে, বাংলা এসব মানবে না, জেনে রাখবেন, এখানে সবার অধিকার রক্ষিত হবে। বাংলাভাষীদের উপর অত্য়াচার হলে ছেড়ে দেব না। আমি ধরলে ছাড়ি না। আমাদের আটকে রাখা যায় না। রোখা যায় না।”
মোদীকে খোঁচা দিয়ে মমতার বক্তব্য, “আপনি আসাম সামলাতে পারছেন না, আর বাংলায় নাক গলাচ্ছেন? নাক গোলানো বন্ধ করুন নাহলে আমরা সবাই যাব আন্দোলন করতে দেখি কত ডিটেনশন ক্যাম্পে আমাদের ভরতে পারেন? দরকার হলে আবার ভাষা আন্দোলন হবে। বাঙালিদের গ্রেপ্তার করবেন আর টেলিপ্রম্পটারে বাংলা লিখে এনে দু লাইন বলে বাঙালিদের মন জয় করবেন? হবে না।”
বাংলায় হবে দুর্গা অঙ্গন
সমুদ্র সৈকত রয়েছে। তাহলে বারে বারে জগন্নাথ দর্শনের জন্য আর ভিন রাজ্যে কেন? তৃণমূল জমানায় মমতা বাংলাতে বানিয়েছেন জগন্নাথ ধাম। এবার বাংলায় হবে দুর্গা অঙ্গন। অর্থাৎ কেবল শরতের বিশেষ সময় নয়, যে কোনও সময়, যে কোনও দিন দেখা যাবে দুর্গা ঠাকুর। মমতা এদিন বলেন, “আমরা মৃত্যুর জন্য তৈরি। বাংলা কিংবা যে কোনও ভাষার উপর অসম্মান মানব না। একটা বিদ্যাসাগরের মূর্তি আঘাত করে রেজাল্ট দেখছিলেন তো। অসমে মা কালী মন্দির ভেঙে দিলেন। যদি তা বাংলায় হত, কী হত? আগে কী বলতেন, মমতাজী দুর্গা পুজা করনে নেহি দেতে হ্যা। সরস্বতী পূজা করনে নেহি দেতে হ্যা। আর নির্বাচনের আগে হঠাৎ মনে পড়ল মা কালী-দুর্গার কথা। মা দুর্গা আমাদের জাতীয় সম্পদ। জগ্ননাথ ধাম যেমন করে দিয়েছি, আগামী দিন জগন্নাথ ধামের অনুকরণে একটা দুর্গা অঙ্গন আমি বাংলায় করে দেব। সারাবছর যাতে বাংলার মানুষ আসতে পারে, দেখতে পারে।”
বাংলায় কাজের অভাব নেই
মঞ্চ থেকে বারে বারে বাংলাভাষীদের উপর বঞ্চনার, অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। মঞ্চ থেকেই আগামীর পরিকল্পনা ঘোষণা করে তিনি বলেন, “২৭ জুলাই নানুর দিবসের দিন থেকে প্রতি শনি-রবিবার বাংলা ভাষার উপর যে অপমান, সন্ত্রাস তার বিরুদ্ধে সব ভাষাভাষী লোকেদের নিয়ে মিটিং-মিছিল করুন। যদি কোনও পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবার খবর দেয়, বিপদে আছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ান, আমাদের জানান। পরিযায়ী শ্রমিকদের বলব ফিরে আসুন। বাংলায় কাজের অভাব নেই। ২৭ জুলাই থেকে ভাষা আন্দোলন শুরু করুন। ভাষার অপমান করলে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বুঝে নেব। ভাষার উপর সন্ত্রাস মানছি না মানব না। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত, টানা এই আন্দোলন চলবে। আপনাদের বলব আপনারা আরও বেশি করে বাংলায় কথা বলুন।”
নদিয়ার তেহট্টের শহিদ ঝন্টু আলি শেখের বাবাকে হাত ধরে সভাস্থলে নিয়ে আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর গলায় পরিয়ে দেন উত্তরীয়। তারপর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় ১ লক্ষ টাকা। এর আগে মুর্শিদাবাদ সফরে গিয়ে উধমপুরে জঙ্গিদের গুলিতে নিহত কমান্ডো ঝনটু আলি শেখের পরিবারের হাতে আর্থিক সাহায্য তুলে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। নিহত কমান্ডোর স্ত্রীকে চাকরি দেওয়ার কথাও বলা হয়। দুঃখে বুক ভাঙলেও, শহিদ ছেলের জন্য গর্বিত বাবা সবুর আলি শেখ।
অন্যদিকে, কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ঘুরতে গিয়ে জঙ্গিদের হাতে বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছিলেন কলকাতার বিতান অধিকারী । সেই বিতানের মা-বাবার হাতেও ১ লক্ষ টাকা সাহায্য অর্থ তুলে দেওয়া হল ২১ জুলাই সভাস্থলে। পহেলগাঁওয়ের ঘটনার পর বিতানের পরিবারের সদস্যের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিন ২১ জুলাই সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়ে বিতানের মা ও বাবাকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মান জানালেন। তৃণমূল সুপ্রিমো জানালেন, তৃণমূলের কর্মীরা এই দুই পরিবারকে সাহায্য করতে ১ টাকা করে দিয়েছেন। তাতেই এই অর্থ জোগাড় করা সম্ভব হয়েছে।
কেন ভারত পাক অধিকৃত কাশ্মীর দখল করতে পারল না? সেই প্রশ্ন তুলে মঞ্চ থেকে নাম না করে মোদি ও তাঁর মন্ত্রিসভাকে বিঁধে বললেন, “আপনারা তো ট্রাম্পের কথায় চলেন। আপনাদের কন্ট্রোল করছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।”
সোমবার তৃণমূলের সমাবেশে উপস্থিত অসম সরকারের এনআরসি নোটিস পাওয়া দিনহাটার বাসিন্দা উত্তমকুমার ব্রজবাসী। দিন কয়েক আগে তৃণমূল সরকার এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছিলেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। ধর্মতলার সমাবেশ মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “অসমের মুখ্যমন্ত্রী বাংলা নিয়ে কথা বলছে। অসমকে সামলাতে পারছেন না, আপনি বাংলায় নাক গলাচ্ছেন? নাক গলানো বন্ধ করুন। নয়তো এমন আন্দোলন গড়ে তুলব, সবাই যাব সেখানে। দেখি কত ডিটেনশন ক্যাম্প, জেলে আমাদের ভরতে পারে।”
কর্মী সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “২০২৬ সালে আরও বেশি আসন নিয়ে জিততে হবে। তারপর আমাদের লক্ষ্য হবে দিল্লি। দিল্লিতে বিজেপিকে হারাতে হবে। দিল্লি থেকে বিজেপিকে সরাতে হবে।”