সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
আইনের চোখে সকলেই সমান। শাসক দল এবং বিরোধীদলের জন্য আলাদা আলাদা আইন হতে পারে না। কোন বিশেষ কারণে শাসকদলের বিধায়কদের যদি বিশেষ কোনো সুবিধে দেওয়া হয় তাহলে অন্য বার্তা যেতে পারে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দায়ের করা মামলায় এভাবেই রাজ্য সরকার এবং বিধানসভার সচিবালয়কে কড়া বার্তা দিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অমৃতা সিনহা।
বিচারপতি অমৃতা সিনহার স্পষ্ট জানালেন, বিধানসভার অধ্যক্ষকে সকল সদস্যকে সমানভাবে দেখতে হবে। কোনও ভেদাভেদ চলবে না। নিরাপত্তা কিংবা বিশেষ সুবিধার ক্ষেত্রে আলাদা আইন হতে পারে না। প্রত্যেক বিধায়কই সমান। অধ্যক্ষের দায়িত্ব হল তাঁদের একই দৃষ্টিতে দেখা। নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে ভেদাভেদ চলতে পারে না। নিয়ম অনুযায়ী বুলেটিন প্রকাশ করতে হবে। একবার আইন যা স্থির হয়েছে, তা সব সদস্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
তৃণমূল বিধায়কদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে বিধানসভা এলাকার মধ্যে প্রবেশ করার অনুমতি রয়েছে। অথচ বিজেপি বিধায়কদের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তারক্ষীদের ভিতরে ঢোকার অনুমতি নেই। তাঁদের বিধানসভার বাইরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এই অভিযোগ তুলে হাই কোর্টে মামলা করেছিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু-সহ বিজেপি বিধায়কদের নিরাপত্তায় কেন্দ্রীয় বাহিনী রয়েছে। বিধানসভার ভিতরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তাকর্মীদের প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অন্য দিকে, বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূল বিধায়কেরা পুলিশি নিরাপত্তা নিয়েই বিধানসভায় প্রবেশ করেন। স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে মামলা করেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু।
বিরোধী দলনেতার দায়ের করা মামলায় বিধানসভার সচিবালয়ের বক্তব্য জানতে চাই জবাবদিহি তলব করেছিল কলকাতা হাইকোর্ট। হাইকোর্টের নির্দেশে বিধানসভার সচিব রিপোর্ট দিয়ে জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে মন্ত্রী, বিধায়ক-সহ সকল সদস্যের জন্য নোটিস রয়েছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে কেউ বিধানসভার অন্দরে প্রবেশ করতে পারবেন না।
এর আগে এই মামলার শুনানি চলাকালীন বিচারপতি অমৃতা সিনহা প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছিলেন, শুভেন্দু অধিকারী কেন্দ্র এবং রাজ্য দু’টি নিরাপত্তাই পান? বিধানসভার ভিতরে কি হুমকির বিষয় আছে নাকি! যে নিরাপত্তার প্রয়োজন? উত্তরে শুভেন্দুর আইনজীবী অভিযোগ করেন, অনেক সময় বিধানসভা ভবনে বাইরের লোক ঢুকে পড়ছেন! তাঁরা হুমকি দিচ্ছেন। এর পরেই পাল্টা বিচারপতি অমৃতা সিনহা জানতে চেয়েছিলেন, কী ভাবে বাইরের কেউ বিধানসভার ভিতরে ঢুকে হুমকি দিতে পারেন?
তৃণমূল বিধায়কদের দিকে ইঙ্গিত করে বিরোধী দলনেতার আইনজীবী বলেন, বিধায়ক বিধায়ককে আক্রমণ করছেন। তাঁদের সঙ্গে পুলিশ রয়েছে। কিন্তু বিজেপি বিধায়কদের সঙ্গে পুলিশ নেই। শুভেন্দুর আইনজীবীদের অভিযোগ, বিধানসভার ভিতরে শাসকদলের বিধায়কদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন স্পিকার। কিন্তু বিরোধী দলনেতা বা বিজেপি বিধায়কদের নিরাপত্তায় থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। তাঁদের প্রশ্ন, স্পিকার কি দু’রকম অবস্থান নিতে পারেন? বিচারপতি অমৃতা সিনহা এর পরে প্রশ্ন তোলেন, কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হল? শুভেন্দুর আইনজীবীরা জানান, অতীতে কয়েকটি ঘটনার প্রেক্ষিতে ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্পিকার।
প্রসঙ্গত, গত বছরের আগস্টে শুভেন্দু অধিকারী যখন বিধানসভার ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছিলেন, তখন তাঁকে লক্ষ্য করে পূর্বস্থলী উত্তরের তৃণমূল বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। সেই সময় তৃণমূল বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায় তাঁকে ধাক্কা মারেন বলে অভিযোগ করেছিলেন শুভেন্দু। তখন বিজেপি বিধায়কদের নিরাপত্তা চেয়ে পদ্মশিবিরের তরফে স্পিকারকে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে স্পিকার কোনও কর্ণপাত করেননি বলে অভিযোগ জানানো হয় বিজেপির তরফ থেকে।