শোভন গায়েন। কলকাতা সারাদিন।
সুপ্রিম কোর্টের চরম হুঁশিয়ারিতে বাধ্য হয়ে অবশেষে ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় চাকরি পাওয়া দাগি অযোগ্যদের নামের তালিকা প্রকাশ করল পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন। শনিবার রাতে প্রথম তালিকা প্রকাশ করার পরে মধ্যরাতের পরে আরো একবার দ্বিতীয় তালিকা প্রকাশ করল স্কুল সার্ভিস কমিশন। আর স্কুল সার্ভিস কমিশনের তরফে প্রকাশিত এই দাগী অযোগ্যদের নামের তালিকা সামনে আসার পরেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র নিন্দা এবং সমালোচনার ঝড়। কারণ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রকাশিত এই তালিকায় একদিকে যেমন রয়েছে রাজ্যের মন্ত্রীর কন্যা, তৃণমূল বিধায়কের মেয়ে থেকে শুরু করে সোনারপুরের পরপর তিনবার তৃণমূলের টিকিটের নির্বাচিত তৃণমূল কাউন্সিলরের নাম।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল, সাত দিনের মধ্যে তালিকা প্রকাশ করতে হবে। আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই, শনিবার রাতে বহু টালবাহানার পরে কমিশনের ওয়েবসাইটে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকায় মোট ১৮০৪ জনের নাম প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই তালিকা প্রকাশ্যে আসতেই রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে। একাধিক তৃণমূল নেতানেত্রী, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নাম রয়েছে সেই অযোগ্য তালিকায়। যেমন নাম রয়েছে রাজপুর-সোনারপুরের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর কুহেলি ঘোষের। তিনি রাজপুরের এক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। এসএসসি-র প্রকাশিত অযোগ্যদের তালিকায় ১৮০৪ জনের মধ্যে রয়েছে পানিহাটির তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষের পুত্রবধূ শম্পা ঘোষের নামও৷ তালিকার ১২৬৯ নম্বরে নাম রয়েছে তৃণমূলের অন্যতম সিনিয়র এই বিধায়কের পুত্রবধূর নাম৷ শনিবার মাঝরাতে সেই অযোগ্য তালিকায় স্কুল সার্ভিস কমিশন যুক্ত করল আরও দুই নাম। তার মধ্যে একজন হলেন চোপড়ায় তৃণমূল বিধায়ক হামিদুল রহমানের মেয়ে। তাঁর নাম রোশনারা বেগম। ২০২২-এর তালিকাতেও ছিল তাঁর নাম। চোপড়ায় তৃণমূল বিধায়ক হামিদুল রহমানের মেয়ে পড়াতেন কালীগঞ্জ হাইস্কুলে। ‘দাগি’ অর্থাৎ অযোগ্য শিক্ষকদের তালিকায় রয়েছে তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি থেকে কাউন্সিলারের নামও। পিংলার জলচক পঞ্চায়েত এলাকার তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি অজয় মাঝি। স্কুল সার্ভিস কমিশন তাদের ওয়েবসাইটে যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে শুধু চোপড়ার বিধায়কের কন্যাই নন, রয়েছেন তৃণমূলের বহু প্রভাবশালী নেতা ও বিধায়ক ঘনিষ্ঠরা। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তের সূত্রপাত যাকে কেন্দ্র করে, সেই অঙ্কিতা অধিকারীর নামও রয়েছে তালিকায়।
তবে শুধুমাত্র যে বর্তমান তৃণমূল নেতা-নেত্রীদের বা তাদের পরিবারের নাম অযোগ্যদের তালিকায় রয়েছে তা নয়, সমস্যার আঁচ পৌঁছেছে বিজেপি শিবিরেও। শনিবার সন্ধ্যায় এসএসসি-র প্রকাশিত ১৮০৪ জন চাকরি হারানো অযোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছে উত্তর দিনাজপুরের বিজেপি নেত্রী কবিতা বর্মনের নামও৷ উত্তর দিনাজপুরের জেলা পরিষদের প্রাক্তন সভাধিপতি৷ আবার স্কুলের শিক্ষিকাও ছিলেন৷ তৃণমূল ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন বিজেপি-তে৷ এত দাপুটে নেত্রী হয়েও শেষ রক্ষা হল না৷ রাজপুর সোনারপুর পৌরসভার তৃণমূল কাউন্সিলর কুহেলি ঘোষ নিজের নাম অযোগ্যদের তালিকায় দেখার পর বলেন, আমি আগেই মামলা করেছিলাম। সিবিআই-কে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছিলাম। আদালতে বলে এসেছিলাম, আমাকে যে কোনও তদন্তকারী সংস্থা ডাকুক। কিন্তু আমাকে আজ পর্যন্ত কেউ ডাকেনি। গতকাল জানতে পারি তালিকা প্রকাশ হবে। সেই তালিকায় আমার নাম আছে। কিন্তু কেন আমার নাম আছে, সেটা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। খানাকুলের দাপুটে তৃণমূল নেতা বলে পরিচিত বিভাসের নাম রয়েছে ৩১৬ নম্বরে। হুগলির প্রাক্তন জেলা পরিষদের সদস্য তিনি। বিভাস তারকেশ্বরের একটি বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। শুধু বিভাসের নাম নয়, ১৩৩২ নম্বরে নাম রয়েছে বিভাসের স্ত্রী সন্তোষি মালিকেরও। ওই তালিকায় নাম রয়েছে জেলা পরিষদের সদস্যা সাহিনা সুলতানার। হুগলির আর এক দাপুটে নেতা মইনুল হকের স্ত্রী নমিতা আদকের নামও রয়েছে অযোগ্যদের তালিকায়।
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো এই অযোগ্যদের মধ্যে যাঁরা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন, তাঁদের তালিকাও প্রকাশ করে অ্যাডমিট কার্ড বাতিল করেছে কমিশন৷