সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আরএসএস বা হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলো কোনওদিনই পছন্দ করেনি। এঁরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুক্তমনা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে ছোট করতে চেয়েছিলেন। এবার সরকারি নির্দেশের মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্রকে বড় করার নামে রবীন্দ্রনাথকে ছোট করা হল। এভাবেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তি জারি করে বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা বন্দেমাতরম গানটি ভারতের জাতীয় সংগীত রবীন্দ্রনাথের জনগণমন-র আগে গাওয়ার নির্দেশিকার ব্যাখ্যা করলেন বাংলার শিক্ষা মন্ত্রী ব্রাত্য বসু।
কেন্দ্রের মোদি সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, বাংলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে আপনারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের মতো দরিদ্র, সমাজের পিছিয়ে থাকা আদিবাসী, তফসিলি জাতি-উপজাতি ভাইদের জীবেন দাম দেন না। এতে আপনাদের হীনমন্যতা প্রকাশ্যে চলে আসছে। এসব কেন করছেন? কারণ একদিন বাংলা আপনাদের উপর রাজত্ব করেছে। একদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র বসুরা আপনাদের মাথার উপর ছিল। তাই আপনাদের এই বাংলা বিদ্বেষ।
গতকাল অর্থাৎ বুধবার হঠাৎ করেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে রীতিমতো নির্দেশিকা জারি করে জানানো হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বন্দেমাতরম গানকে রাষ্ট্রীয় সংগীতের মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি এবার থেকে জাতীয় সংগীতের সমমর্যাদায় বন্দেমাতরম গাওয়া অথবা বাজানোর সময় সকলকে উঠে দাঁড়াতে হবে বাধ্যতামূলকভাবে। শুধু তাই নয় সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ভাবে বন্দেমাতরম গাওয়ার পাশাপাশি দেশের সমস্ত স্কুলেও দিন শুরু করতে হবে বন্দেমাতরম গেয়ে। সেই সঙ্গে ১৯৩৭ সালে জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধী এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর উপস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বন্দেমাতরমের যে বিতর্কিত স্তবক গুলি প্রকাশ্যে না গাওয়ার সুপারিশ করে সুরারোপ করেছিলেন, সেই সমস্ত বিতর্কিত স্তবক গুলিও দেশজুড়ে গাওয়ার ফরমান জারি করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। এমনকি কোন সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত জনগণমন এবং রাষ্ট্রীয় সংগীত বন্দেমাতরম গাওয়া হলে সেখানে জাতীয় সঙ্গীতের আগে বন্দেমাতরম গাইতে হবে বলেও ফরমানে উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।
তবে রবীন্দ্রনাথের লেখা জনগণমন গানের পরিবর্তে আরএসএস-এর এজেন্ডা মেনে কেন্দ্রে ভারতীয় জনতা পার্টি সরকার ভবিষ্যতের বন্দেমাতরম-কে দেশের জাতীয় সংগীত করতে পারে বলেও তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে দেশজুড়ে। এবারে কেন্দ্রের মোদি সরকারের এই পদক্ষেপের পিছনে রবীন্দ্রনাথ এবং বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ তৈরির চেষ্টা রয়েছে বলে অভিযোগ করলেন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু।
ব্রাত্য বসু বলেন, আমরা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং বন্দে মাতরম-কে সম্মান করি। কিন্তু তা যে ভাবে বিজেপি উপস্থাপন করছে, তাতে তারা জনগণমন এবং রবীন্দ্রনাথকে খাটো করা হয়। বিজেপি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পছন্দ করে না। হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি কোনওদিনই রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ করে না। কারণ, তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। তিনি আজীবন ধর্ম এবং বর্ণের মধ্যে ঐক্য সাধনের চেষ্টা করেছেন। তা তাঁর লেখাতেও বার বার উঠে এসেছে। তাঁর মুক্তমনা দৃষ্টিভঙ্গি সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি পছন্দ করেনি। এই নির্দেশের মাধ্যমে তারা বঙ্কিমচন্দ্রকে বড় করার নামে আসলে রবীন্দ্রনাথকে ছোট করলেন। এর পাশাপাশি ব্রাত্যর দাবি, মাস তিনেকের জন্য এই নির্দেশিকা, বাগাড়ম্বর থাকবে। তারপরে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রী হবেন, তখন এই নির্দেশিকার হদিস কেউ রাখবে না।

বিপ্লব দেবের বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া
বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনে গিয়ে আসতেই প্রত্যেকবারের মতো নিয়ম মেনে ভিন রাজ্যের ভাজপা নেতাদের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছে বাংলায়। সেই তালিকায় রয়েছেন বাংলায় ভারতীয় জনতা পার্টির তরফে নিযুক্ত কেন্দ্রীয় সহ-পর্যবেক্ষক বিপ্লব দেব। গতকাল সন্ধ্যায় বরানগরে রাজনৈতিক কর্মসূচি সেরে একটি মন্দিরে পূজো দিয়ে বিপ্লব দেব বাংলায় আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, রক্তগঙ্গা বয়ে যাক আর মহাসাগর বয়ে যাক, মানুষের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। মানুষ বদল চাইছে। মানুষ ঠিক করে নিয়েছে, এবার বিজেপির সরকার হবেই। এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পার্টিটাই আর থাকবে না।
ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এমন বিতর্কিত মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ব্রাত্য বসু বলেন, বিজেপি সরকার গঠন করে আবার ওঁর মতো কাউকে মুখ্যমন্ত্রী করবে না তো, যে দু’বছরের মধ্যে ঘাড়ধাক্কা দিতে হয়?