সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে হঠাৎই এক বড় নাটকীয় মোড়। আচমকা রাজ্যপালের পদ থেকে ইস্তফা দিলেন সি ভি আনন্দ বোস। বৃহস্পতিবার বিকেলে দিল্লিতে পৌঁছে রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। সূত্রের খবর, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সেই ইস্তফাপত্র গ্রহণও করেছেন। এই ঘটনার পরই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে শুরু হয়েছে জল্পনা ও বিতর্ক।
রাজভবন সূত্রে জানা গেছে, আপাতত তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল আর এন রবিকে পশ্চিমবঙ্গের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তিনিই রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধানের দায়িত্ব সামলাবেন।
রাজ্যপালের এই আকস্মিক পদত্যাগ নিয়ে ইতিমধ্যেই সরব মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সামাজিক মাধ্যমে এক বিবৃতিতে জানান, ঘটনাটি তাঁকে বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, এখনও পর্যন্ত পদত্যাগের প্রকৃত কারণ তাঁর জানা নেই। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তিনি মনে করছেন, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা হতে পারে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁকে ফোনে জানিয়েছেন যে আর এন রবিকে পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এই বিষয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনও আলোচনা করা হয়নি। তাঁর মতে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাবনাকে দুর্বল করে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, রাজ্যপালের পদত্যাগের সময়টা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আগামী বছরই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। সেই প্রেক্ষাপটে রাজ্যপাল পরিবর্তন প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন সি ভি আনন্দ বোস। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী তাঁর মেয়াদ ছিল ২০২৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের প্রায় কুড়ি মাস আগেই তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে?
গত সাড়ে তিন বছরে নবান্ন ও রাজভবনের সম্পর্ক একাধিকবার টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকার এবং রাজ্যপালের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলছিল। রাজ্যপাল একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্বর্তী উপাচার্য নিয়োগ করায় শিক্ষামন্ত্রী এবং সরকারের সঙ্গে তাঁর সংঘাত প্রকাশ্যে আসে।
শুধু শিক্ষাক্ষেত্রই নয়, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও তিনি বারবার সরব হয়েছেন। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় অশান্তির অভিযোগ উঠলে তিনি সরাসরি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতেন। এই সক্রিয় ভূমিকা অনেক সময় রাজনৈতিক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় প্রকল্প, রাজ্যের আর্থিক বকেয়া কিংবা প্রশাসনিক বিষয়েও তিনি দিল্লিতে একাধিক রিপোর্ট পাঠিয়েছেন বলে জানা যায়। ফলে রাজ্য সরকার ও রাজ্যপালের সম্পর্ক প্রায়ই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তাঁর পদত্যাগ রাজ্যের প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ভোটের আগে রাজ্যপাল পদে পরিবর্তন অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।
এদিকে যাঁকে আপাতত পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেই আর এন রবি একজন প্রাক্তন আইপিএস অফিসার এবং অভিজ্ঞ প্রশাসক হিসেবে পরিচিত। কঠোর প্রশাসনিক মনোভাব এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ফলে নির্বাচনকে সামনে রেখে তাঁর এই দায়িত্ব গ্রহণকে অনেকেই রাজনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন।
অন্যদিকে সি ভি আনন্দ বোস রাজ্যপাল হিসেবে বেশ কয়েকটি উদ্যোগের জন্য আলোচনায় ছিলেন। রাজভবনের নাম পরিবর্তন করে ‘লোকভবন’ করার সিদ্ধান্তও তাঁর সময়েই নেওয়া হয়েছিল। সাংবিধানিক পদে থেকেও তিনি বেশ সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন, যা রাজ্য রাজনীতিতে আলাদা মাত্রা যোগ করেছিল।

তাঁর এই আকস্মিক বিদায়ে এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে আসছে। তিনি কি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেন, নাকি কোনও চাপের কারণে এই সিদ্ধান্ত নিতে হল? সরকারিভাবে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে স্পষ্ট কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যপালের এই পদত্যাগ বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন নজর দিল্লির দিকে—কেন্দ্র কাকে স্থায়ী রাজ্যপাল হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে পাঠায় এবং সেই সিদ্ধান্ত রাজ্য রাজনীতির সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটাই দেখার।