সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
সম্প্রতি বিজেপির আইটি সেল প্রধান অমিত মালব্য একাধিকবার বিতর্কে জড়িয়েছেন বাংলা ভাষা ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কে ঘিরে মন্তব্য করে। তাঁর ৪ আগস্টের পোস্ট ঘিরে যেমন উঠেছিল সমালোচনার ঝড়, তেমনি ৮ আগস্ট রবীন্দ্রপ্রয়াণ দিবসে করা তাঁর টুইট আবারও রাজনৈতিক ও ভাষাগত বিতর্কে ঘৃতাহুতি দিয়েছে।
৪ আগস্টের পোস্ট: ‘বাংলাদেশি ভাষা’ মন্তব্যে আগুন
৪ আগস্ট একটি পোস্টে অমিত মালব্য দাবি করেন, দিল্লি পুলিশ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করতে “বাংলাদেশি ভাষা” শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছে, এবং এটি একটি বিশেষ ধরণের ভাষার রূপ, যার উপভাষা ও উচ্চারণ পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষা থেকে আলাদা। সিলেটি, নোয়াখালির মতো উপভাষা নাকি ভারতীয় বাঙালিদের কাছে প্রায় বোধগম্য নয়—এমন মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “বাংলা ভাষা বলে কোনও একক ভাষা নেই যা সমস্ত ভিন্নতা ঢেকে দেয়। ‘বাঙালি’ শব্দটি ভাষাগত নয়, বরং জাতিগত পরিচয় নির্দেশ করে।” এই মন্তব্য বাংলা ভাষার অস্তিত্ব, বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এই পোস্টের জেরে তৃণমূল সহ বিভিন্ন বিরোধী দল, বুদ্ধিজীবী মহল, ভাষাবিদ ও সাধারণ মানুষ সোচ্চার হন। তাঁরা অভিযোগ তোলেন, এটি বাঙালিদের অপমান এবং বাংলা ভাষাকে খাটো করার প্রচেষ্টা।
৮ আগস্টের পোস্ট: রবি ঠাকুরকে ঘিরে ড্যামেজ কন্ট্রোল?
সমালোচনার মাঝেই অমিত মালব্য ৮ আগস্ট টুইটে লেখেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষাকে দেশ ও বিদেশে উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি বাংলা ভাষার সাহিত্যিক সমৃদ্ধি ও রবীন্দ্রনাথের প্রভাব নিয়ে প্রশংসা করেন। লেখেন, “বাংলা এখন ভারতের দ্বিতীয় সর্বাধিক কথ্য ভাষা এবং বিশ্বে দশটি সর্বাধিক কথ্য ভাষার অন্যতম।”
তবে এই পোস্টেই ফের ধরা পড়ে তথ্যগত ভুল। তিনি লেখেন, রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয় ‘সং অফারিংস’ এর জন্য, যা তিনি রুটিন অনুবাদের ভিত্তিতে পাননি—এটি ঠিক। কিন্তু তাঁর পোস্টে এমন কিছু বক্তব্য ছিল, যা রবীন্দ্রসাহিত্য সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাব প্রকাশ করে।
কুণাল ঘোষের পাল্টা জবাব
তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ তৎক্ষণাৎ লিখলেন, “অমিত মালব্য রবীন্দ্রনাথকে সামনে এনে বাংলা নিয়ে নিজেদের অপমানজনক কথার ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে চেয়েছেন। কিন্তু বিষয় না জেনে পোস্ট করে তালগোল পাকিয়েছেন।”
তিনি জানান:
1. ‘Song Offerings’ কেবল গীতাঞ্জলীর অনুবাদ নয়, রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁর বিভিন্ন কবিতার গদ্য অনুবাদ করেছিলেন।
2. এটি একটি স্বতন্ত্র গদ্যভাষায় রচিত সাহিত্য, যা রুটিন অনুবাদ নয়।
3. তিনি যে তথ্য দিয়েছেন, তাতে বোঝা যাচ্ছে ভুল ব্যাখ্যার শিকার হয়েছেন মালব্য নিজেই।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিক্রিয়া
বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি অত্যাচার, বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা, এবং এখন রবীন্দ্রনাথকে হাতিয়ার করে পোস্ট—সব মিলিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক আবহ উত্তপ্ত।
তৃণমূল নেতারা বলছেন, “যে ব্যক্তি কিছুদিন আগেই বাংলার ভাষাগত বৈচিত্র্যকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন, তিনি এখন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সৌজন্য টুইট করছেন—এটা লোকদেখানো। এর মাধ্যমে তিনি বাংলার মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করছেন।”
বাংলা ভাষা কি রাজনৈতিক হাতিয়ার?
যেখানে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য পূর্ব ভারতের আত্মপরিচয়ের মূল স্তম্ভ, সেখানে বিজেপি-র নেতাদের মন্তব্য বারবার সাংস্কৃতিক সংঘাত তৈরি করছে। মালব্যর পোস্ট ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা বোঝায় ভাষা কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আবেগ, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চেতনার সাথেও গভীরভাবে জড়িত।

Amit Malviya Bengali language controversy এখন আর নিছক সোশ্যাল মিডিয়া বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। এটি হয়ে উঠেছে রাজনীতির কৌশলগত চাল, যেখানে রবীন্দ্রনাথের মতো মহামানবকেও ব্যবহার করা হচ্ছে ভুল বার্তার ড্যামেজ কন্ট্রোলে। কিন্তু ইতিহাস, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি নিয়ে মন্তব্য করার আগে সঠিক জ্ঞান ও শ্রদ্ধা না থাকলে, বিপদ আরও বাড়ে—তা আবারও প্রমাণ করলেন অমিত মালব্য।