২০১৪ সালের মে মাসে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড়সড় পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষত দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম এবং ঘুষ সংক্রান্ত মামলায় কেন্দ্রীয় সংস্থা যেমন সিবিআই (CBI) ও ইডি (ED)–র পদক্ষেপে বহু বিরোধী দলের নেতানেত্রী এবং মন্ত্রীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ এক নজিরবিহীন ঘটনা, যেখানে অন্তত ১২ জন বিরোধী দলের মন্ত্রী গ্রেফতার হয়েছেন।
নতুন বিলের বিধান
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার যে নতুন বিলের প্রস্তাব এনেছে, তাতে বলা হয়েছে, কোনো মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী যদি গুরুতর অভিযোগে গ্রেফতার হন এবং ধারাবাহিকভাবে ৩০ দিন কারাগারে থাকতে হয়, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর মন্ত্রিত্ব খারিজ হয়ে যাবে। অর্থাৎ আদালতের রায় বা দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষা না করেই তাঁকে মন্ত্রীত্বের আসন ছাড়তে হবে।
কোন কোন দলের মন্ত্রীরা গ্রেফতার হয়েছেন
২০১৪ সালের পর থেকে এই ১২ জন মন্ত্রীর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই বিরোধী দলের। সবচেয়ে বেশি গ্রেফতার হওয়া মন্ত্রীর সংখ্যা তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)–এর – মোট পাঁচজন। এরপর রয়েছে আম আদমি পার্টি (AAP)–এর চারজন, এবং একজন করে ডিএমকে (DMK) ও এনসিপি (NCP)–এর মন্ত্রী।
এই গ্রেফতারগুলির মধ্যে ১০টি মামলা সিবিআই ও ইডি করেছে। দুটি ক্ষেত্রে অন্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা যুক্ত ছিল।
বিজেপি বা এনডিএর কোনও মন্ত্রী গ্রেফতার হননি
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বিজেপি বা তার মিত্র দলের কোনও মন্ত্রীকে এসময়কালে গুরুতর অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়নি। যদিও উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী রাকেশ সাচান পুরনো অস্ত্র আইন মামলায় এক বছরের সাজা পান, তবু তাঁকে গ্রেফতার করা হয়নি এবং তিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে এখনও মন্ত্রীর পদে রয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে কেবল কেজরিওয়াল গ্রেফতার
গ্রেফতার হওয়া মন্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী হলেন দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তিনি দুর্নীতি মামলায় ইডি–র হাতে গ্রেফতার হন। অন্যদিকে, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার নেতা হেমন্ত সোরেনকে ইডি গ্রেফতার করার আগে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন।
বিরোধীদের অভিযোগ
বিরোধী শিবিরের মতে, এসব গ্রেফতার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি বিজেপির বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু বিরোধী দলের নেতাদের টার্গেট করছে। এর ফলে দেশে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং শাসকদল প্রশাসনিক ক্ষমতাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
সরকারের বক্তব্য
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, আইনের চোখে সবাই সমান। কেউ দুর্নীতিতে জড়িত থাকলে, সে বিরোধী দলের হোক বা শাসক দলের, তাঁকে আইনের মুখোমুখি হতেই হবে। সরকার মনে করে, দুর্নীতি রোধে এই ধরনের কঠোর আইন প্রয়োজন এবং এতে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা বাড়বে।
সম্ভাব্য প্রভাব
নতুন বিল কার্যকর হলে বিরোধী শিবিরে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। কারণ, গত এক দশকের পরিসংখ্যান দেখালে স্পষ্ট হয় যে বিরোধী দলের বহু মন্ত্রী তদন্তের জালে আটকা পড়েছেন। যদি তাঁরা আবার গ্রেফতার হন এবং ৩০ দিনের বেশি কারাগারে থাকতে হয়, তবে তাঁদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে মন্ত্রীত্ব চলে যাবে।
এতে একদিকে সরকার দুর্নীতি দমনে শক্তিশালী অবস্থান নেবে, অন্যদিকে বিরোধীরা অভিযোগ তুলবে যে তাঁদের নেতৃত্বকে পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্নীতি এবং ক্ষমতার লড়াই নতুন কিছু নয়। কিন্তু ২০১৪–এর পর থেকে বিরোধী দলের এত সংখ্যক মন্ত্রী গ্রেফতার হওয়া নজিরবিহীন। নতুন বিল কার্যকর হলে এর রাজনৈতিক অভিঘাত আরও তীব্র হতে পারে। একদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেওয়া হবে, অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ বাড়বে যে তাঁদের উপর রাজনৈতিক চাপে এই সব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতে এই আইন দেশের রাজনীতিকে কতটা বদলে দেবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট – আগামী দিনে ভারতীয় রাজনীতিতে দুর্নীতি ও তদন্তের প্রশ্ন আরও কেন্দ্রীয় হয়ে উঠবে।