সুমনা মিশ্র। কলকাতা সারাদিন।
বাংলায় ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে দেশের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার আতঙ্কে আত্মহত্যার ঘটনা অব্যাহত। উত্তর 24 পরগনার পানিহাটি পুরসভার অন্তর্গত আগরপাড়ায় প্রদীপ করে আত্মহত্যা দিয়ে যে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাক্রমের শুরু হয়েছিল মাত্র ৬ দিনের মধ্যে আজ দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে মারা গেলেন অষ্টম ব্যক্তি।
উত্তর ২৪ পরগনার ঘুসিঘাটা এলাকার বাসিন্দা শফিকুল গাজী কয়েকদিন আগেই এসেছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙ্গড়ে। কিছুদিন আগেই একটি দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার ফলে ভাঙ্গড়ের জয়পুরে নিজের শ্বশুর বাড়িতে এসে চিকিৎসা করাচ্ছিলেন মৃত শফিকুল। কিন্তু গত মঙ্গলবার থেকে বাংলায় ভোটার তালিকায় এসআইআর প্রক্রিয়ার শুরু হওয়ার বেশ কিছুদিন আগেই যেভাবে বাংলায় বিজেপি নেতারা বারে বারে প্রচার করছেন ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে তাদেরকে দেশ থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হবে এবং বেছে বেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের তাড়ানো হবে বলে স্থানীয় কিছু বিজেপি নেতা হুঁশিয়ারি দেওয়াতে নাকি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন শফিকুল। আজ সকালে বাড়ি থেকে মাঠের দিকে ছাগল বাঁধতে গিয়ে কাছে থাকা গামছা গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। জানা গিয়েছে গতকাল স্থানীয় ভোট কর্মী নাকি তাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যেহেতু তার নাম নেই তাই এর আগের নথিপত্র জোগাড় করার জন্য। এরপর থেকে এই রাতে না ঘুমিয়ে উসখুস করছিলেন মৃত শফিকুল।
মৃতের স্ত্রী বলেন, ‘এসআইআর নিয়ে আতঙ্কে ছিল। খালি বলত, ‘আমার তো পরিচয়পত্র নেই। আমাকে তাড়িয়ে দেবে।’ অসুস্থও হয়ে পড়েছিল। সকালে আমি চা দিয়ে ছাগল বাঁধতে গিয়েছিল। সেই সময় গলায় গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে।’
সফিকুলের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই তাঁর বাড়িতে যান তৃণমূলের ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক শওকত মোল্লা। তৃণমূলের সর্রভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশেই তিনি মৃতের বাড়িতে গিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বলে বিধায়ক। তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার পর্যন্ত সাত জনের মৃত্যু হয়েছে এসআইআর আতঙ্কে। আজ আমাদের ভাঙড়ে। বিজেপির চক্রান্তেই এ সব হচ্ছে!’
প্রসঙ্গত গতকাল রেডরোড থেকে উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল যে এস আই আর বিরোধী প্রতিবাদে মিছিলের আয়োজন করেছিল সেখানেও যোগ দেন বাংলায় এসআইআর ঘোষণার পর থেকে আতঙ্কে আত্মহত্যা করা ব্যক্তিদের পরিবার গুলি। জাতীয় নির্বাচন কমিশন স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের সূচি ঘোষণার পর থেকে রাজ্যে বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, এসআইআর নিয়ে আতঙ্কেও উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটির প্রদীপ কর কিংবা বীরভূমের ইলামবাজারের ক্ষিতীশ মজুমদার আত্মহত্যা করেছেন। জোড়াসাঁকোতে মিছিলের শেষে জনসভার জন্য যে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল, তার পাশে একটি বেদি তৈরি করা হয়েছিল। সেই বেদির উপরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ রাখা হয়েছিল। সেই স্মৃতিস্তম্ভে ছিল প্রদীপ কর, ক্ষিতীশ মজুমদার, কাকলি সরকার, বিমল সাঁতরা, হাসিনা বেগম, শেখ সিরাজউদ্দিন এবং জাহির মালের নাম লেখা। মঞ্চের ওঠার আগে মমতা–অভিষেক সমেত তৃণমূল নেতারা এই স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। রেড রোডে মিছিল শুরু হওয়ার আগে অভিষেক ‘এসআইআর’ আতঙ্কে মারা যাওয়া ক্ষিতীশ মজুমদারের পরিবারের সদস্য, টিটাগড়ে মারা যাওয়া মহিলার পরিবারের সদস্য–সহ একাধিক পরিবারের শোকসন্তপ্ত পরিজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

কোচবিহারের দিনহাটা থেকে আসা আমিনা বিবি, গৌতম বর্মণ, টিটাগড় থেকে আসা সবুজ সরকার, ইলামবাজার থেকে আসা হীরুবালা মজুমদারের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন অভিষেক। এই পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। এছাড়া পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগরে যে ব্যক্তি মারা গিয়েছেন ,তাঁর পরিবারের সদস্যর সঙ্গেও কথা বলেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। জোড়াসাঁকোতে মহামিছিলের শেষে জনসভায় অভিষেক এই আত্মহত্যার ঘটনাগুলি নিয়ে বলেন, ‘যে সাতজন আত্মহত্যা করেছেন তাঁদের সকলের নাম ভোটার তালিকায় ছিল এবং পরে কেটে দেওয়া হয়। বাংলা এর জবাব দেবে।’