সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
‘অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলছে ফ্রন্ট। আন্দোলনের কোনও অগ্রগতি নেই।’ এভাবেই অভয়া মঞ্চে ফাটল ধরিয়ে জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন চিকিৎসক অনিকেত মাহাতো। সেই কারণেই ফ্রন্টের পদ ছেড়েছেন বলে স্পষ্টভাবে জানালেন অনিকেত।
২০২৪ সালের আগস্টে আর জি কর হাসপাতালের সেমিনার রুমে নৃশংসভাবে ধর্ষণের পর খুন করা হয় মহিলা চিকিৎসককে। তাঁর ন্যায়বিচারের দাবিতে কঠোর আন্দোলন শুরু করেন সহপাঠীরা। সিবিআই তদন্তভার নিয়ে খুব কম সময়ের মধ্যেই মামলার কিনারা করে ফেলে। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় যাবজ্জীবন কারাবাসে সাজা পায় সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়। কিন্তু এই বিচারে সন্তুষ্ট হননি মৃতার পরিবার, আত্মীয়, বন্ধুরা। তাঁদের অভিযোগ ছিল, কিছু বিষয় গোপনে রেখে, কাউকে আড়াল করে বিচারপ্রক্রিয়া চলেছে। আর তাই আজও তাঁদের আন্দোলন চলছে দেশের শীর্ষ আদালতে। এমতাবস্থায় অভয়ার জন্য আইনি লড়াইয়ের খরচ সংগ্রহ করতে জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট তৈরি করেছিল ‘অভয়া তহবিল।’ এই তহবিল নিযেই যত সমস্যার সূত্রপাত। আর্থিক তছরূপের অভিযোগ ওঠার পাশাপাশি ফ্রন্টের আন্দোলনের অভিমুখ বদলাচ্ছে বলেও অনেকে বলতে শুরু করেন। এসবের মাঝেই বৃহস্পতিবার ইস্তফা দেন ফ্রন্টের সভাপতি অনিকেত মাহাতো। ইস্তফাপত্রে তিনি জানান, বারবার মতানৈক্য সত্ত্বেও তিনি যতটা সম্ভব আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছেন। তিনি ও তাঁর সতীর্থ দেবাশিস হালদার, আসফাকুল্লা নাইয়াদের বদলি নিয়েও প্রতিবাদে মুখর হয়েছিলেন। ফ্রন্টের অসঙ্গতি নিয়ে বারবার নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেও তাঁর কথায় কর্ণপাত করেনি কেউ। এই মুহূর্তে অনিকেতের মনে হয়েছে, ট্রাস্ট ও এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক ঠিক না করে, আইনি পরামর্শ উপেক্ষা করে যেভাবে ফ্রন্ট গঠন হয়েছে, তা অভয়ার ন্যায়বিচারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই ফ্রন্টের তরফে জানানো হয়, অনিকেতের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে পালটা মেল করা হয়েছে। যদিও শুক্রবারের সাংবাদিক বৈঠকে তিনি সাফ জানালেন তিনি কোনও মেল পাননি। জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট থেকে অনিকেত মাহাতো ইস্তফা দেওয়ার পরই নয়া মাত্রা পেয়েছে আরজি কর আন্দোলন। ইতিমধ্যেই পালটা তোপ দেগেছেন অভয়া আন্দোলনের আরেক মুখ আসফাকুল্লা নাইয়া। আসফাকুল্লা নাইয়ার কথায়, ‘অনিকেত একা নেতা হতে পারে না। বাকিরা তো রয়েছে, তারাও লড়াই করেছে অভয়ার ন্যায় বিচারে!’
অন্যদিকে, গত মে মাসে জানা যায়, এ হেন অনিকেতকে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে রায়গঞ্জে। এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। কেন অনিকেতকে আরজি কর থেকে সরিয়ে রায়গঞ্জে পাঠানো হল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন অনিকেত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পছন্দ মতো পোস্টিং না পাওয়া যায়, তা হলে কাউন্সেলিং-এর অর্থ কী? মেধাতালিকারই বা কী প্রয়োজন? পোস্টিং মামলায় হাই কোর্টে ধাক্কা খায় রাজ্য। অনিকেতের পোস্টিং নিয়ে রাজ্যের সিদ্ধান্ত গত সেপ্টেম্বর মাসেই খারিজ করে দিয়েছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু। তিনি জানিয়েছিলেন, রায়গঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ নয়, আরজি করেই পোস্টিং দিতে হবে অনিকেতকে। সিঙ্গল বেঞ্চের রায়ে রাজ্য সন্তুষ্ট ছিল না। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে যায় রাজ্য। কিন্তু বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চও সিঙ্গেল বেঞ্চের নির্দেশ বহাল রাখে। সব শেষে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় রাজ্য। তবে শীর্ষ আদালতও বহাল রাখে হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়। তবে তার পরেও, এখনও পোস্টিং দেওয়া হয়নি অনিকেতকে। তাই এ বার এসআর-শিপ পোস্টিং ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠক করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান অনিকেত। তাঁর কথায়, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে আমার ডাক্তারি জীবনকে খুন করতে চায় রাজ্য সরকার।’ সিনিয়র রেসিডেন্টশিপ পোস্টিং ছাড়লে সরকারকে মোটা টাকা দিতে হয়। সেই টাকার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে সাহায্য চাইলেন অনিকেত।

শুক্রবার অনিকেত বলেন, ‘আমি এখনও পোস্টিং পাইনি। আমি মনে করি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে করার জায়গা থেকে রাজ্য সরকার আমার ডাক্তারি জীবনকে সত্যিকারের খুনের মতো পদক্ষেপের দিকে এগোতে চায়। আমি স্পষ্ট করে আজ জানাতে চাই, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাচরিতার্থ যে আকার ধারণ করছে, তা থেকে আমি মনে করি রাজ্য সরকার ভবিষ্যতে আমাকে পোস্টিং দেয়, তাতেও ডাক্তার হিসাবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে পারব না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই রাজ্য সরকারের অধীনে আমি এসআর-শিপ করতে চাই না।’