সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
‘ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজে গোড়া থেকে সক্রিয় থাকা ও পরিশ্রম করা সত্ত্বেও এখন শুনানি পর্বে কেন বাদ দেওয়া হচ্ছে বিএলএ-দের?’ এমন প্রশ্ন তুলে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে দীর্ঘ ৪ পাতার চিঠি লিখলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি বয়স্ক, অসুস্থ মানুষজনকে বহু দূরে শুনানির জন্য যেতে হচ্ছে বলে গুরুতর সমস্যার কথাও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠিতে লিখেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, কোনও লিখিত বিজ্ঞপ্তি, সার্কুলার বা আইনি নির্দেশ ছাড়াই একের পর এক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন উঠছে বলেই মত নবান্নের। এই ধরনের অনিশ্চয়তা ভোটারদের নাম অকারণে বাদ পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, যা গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক বলে সতর্ক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর ঘিরে ফের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংঘাতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে এক দীর্ঘ ও কড়া চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করলেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে পশ্চিমবঙ্গে চলছে পরিকল্পনাহীন, খামখেয়ালি ও সংবিধানবিরোধী প্রক্রিয়া। ওই চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, যথাযথ প্রস্তুতি, একরকম নিয়ম ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই এসআইআর চালানো হচ্ছে, যার ফলে গোটা প্রক্রিয়াটিই হয়ে উঠেছে ত্রুটিপূর্ণ ও অবিশ্বাসযোগ্য। কমিশনের নির্দেশ বারবার বদলাচ্ছে, কখনও হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেজে ‘অনানুষ্ঠানিক’ নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে— যার কোনও লিখিত নোটিফিকেশন বা আইনি ভিত্তি নেই।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এই অনিশ্চয়তা ও স্বেচ্ছাচারিতার ফলেই প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা গণতন্ত্রের পক্ষে ভয়ঙ্কর। তাঁর অভিযোগ, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে ব্যাকএন্ড থেকে ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে ফেলা হচ্ছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের অনুমোদনই নেওয়া হয়নি। চিঠিতে আরও উল্লেখ, বিহারে যেখানে ফ্যামিলি রেজিস্টারকে পরিচয়পত্র হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়েছিল, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে হঠাৎ করেই তা বাতিল করা হচ্ছে— তাও আবার হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায়। একইভাবে, রাজ্য সরকারের জারি করা ডোমিসাইল বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্স সার্টিফিকেটকেও অগ্রাহ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।

দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে পাঠানো চিঠিতে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ— শুনানির নামে ভোটারদের হয়রানি। বহু ভোটারকে কেন শুনানিতে ডাকা হচ্ছে, তা জানানো হচ্ছে না। ২০–২৫ কিলোমিটার দূরে কেন্দ্রীয়ভাবে শুনানিতে হাজিরা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে বৃদ্ধ, অসুস্থ ও সাধারণ মানুষকে। নথি জমা দিলেও মিলছে না কোনও রসিদ বা প্রমাণ। এছাড়াও, রাজ্যের প্রস্তাবিত প্যানেল উপেক্ষা করে অবজারভার নিয়োগ, প্রশিক্ষণহীন মাইক্রো অবজারভারদের দায়িত্ব দেওয়া এবং শুনানির সময় বুথ লেভেল এজেন্টদের প্রবেশাধিকার না দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
চিঠির শেষে নির্বাচন কমিশনের কাছে স্পষ্ট দাবি— এই ‘অপরিকল্পিত ও স্বেচ্ছাচারী’ এসআইআর অবিলম্বে বন্ধ করে ত্রুটি সংশোধন করতে হবে। নচেৎ এর পরিণতি হবে ভয়াবহ— ব্যাপক ভোটার বঞ্চনা এবং গণতন্ত্রের মূল কাঠামোর উপর সরাসরি আঘাত।