শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
নজিরবিহীনভাবে রবিবার লোকসভায় ২০২৬-২৭ সালের জন্য কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মত রবিবার বাজেট পেশ করা হয়। তবে সাধারণত লোকসভা নির্বাচনের আগে যেমন দেশ জুড়ে কর ছাড়ে প্রতিশ্রুতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাধারণ বিষয় ছাড় দেওয়ার কথা ঘোষণা করে থাকেন নির্মলা, এবারে তেমন বড় কোন স্যারের ঘোষণা না থাকলেও স্থায়ী পরিকাঠামো উন্নয়নে নজর দেওয়া হয়েছে ভোটমুখী রাজ্যগুলিতে।
বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে পশ্চিমবঙ্গের চাকচিক্যে ভরা একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করা না হলেও বাজেটের একাধিক প্রকল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকল বাংলা। যা গতবারের বাজেটের থেকে বড় পার্থক্য গড়ে দিল। গতবার যখন সংসদে সাধারণ বাজেট পেশ করছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী, তখন কার্যত মনে হচ্ছিল যে বিহারের বাজেট ভাষণ দিচ্ছেন। একাধিক হাইপ্রোফাইল ও শিরোনাম হয়ে ওঠার মতো প্রকল্প দিয়েছিলেন বিহারকে। সবমিলিয়ে ৫৮,৯০০ কোটি টাকার প্রকল্প পেয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের পড়শি রাজ্য। তবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সেই পথে হাঁটেননি সীতারামন। পরিমিত ঘোষণা করেছেন এবারের বাজেটে।
প্রশংসা প্রধানমন্ত্রীর
সংসদে কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করার পরেই সাধারণ জনগণের উদ্দেশে ভাষনে বাজেট নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, ‘এই বাজেট মানুষের চাহিদার বাজেট। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার লক্ষ্যেই এই বাজেট। এতে ভারতের অর্থ ব্যবস্থার আরও উন্নতি হবে। সংস্কার নতুন গতি পাবে। এই বাজেটে মূল্যবৃদ্ধি কমানোর দিশা রয়েছে। আত্মনির্ভর ভারত প্রকল্পেও নতুন দিশা দেবে। বিকশিত ভারত মজবুত হবে। আধুনিক বাস্তুতন্ত্র তৈরি হবে মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে। এই বাজেট পর্যটনে উৎসাহ দিয়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতে পর্যটন বাড়বে এই বাজেটে।’ বাজেটকে ‘সংস্কার এক্সপ্রেস’-এর গতি বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী মোদী জানান, এতে দেশের সংস্কার প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হবে। বিশেষ করে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ কর্মসূচিকে জোরদার করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
নজরে ভোটমুখী রাজ্যগুলি
কেন্দ্রীয় বাজেটে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বেশ কয়েকটি প্রকল্প ঘোষণা করেন। এই বছর পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, তামিলনাড়ু, পুদুচেরি এবং কেরালার মতো রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
কেরালা বাদে, চারটি রাজ্যে মার্চ বা এপ্রিল মাসে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী এই রাজ্যগুলির জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্প ঘোষণা করেন। বাজেটের সময়, নির্মলা সীতারমন ঘোষণা করেন যে ওড়িশা, তামিলনাড়ু এবং অন্ধ্রপ্রদেশে নিবেদিতপ্রাণ খনিজ উদ্যান স্থাপন করা হবে। তিনি বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত একটি রেল করিডোরও প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি কেরালা এবং তামিলনাড়ুতে একটি বিরল পৃথিবী করিডোর নির্মাণেরও প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন ওড়িশা, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুর মতো খনিজ সমৃদ্ধ রাজ্যগুলিকে খনি, প্রক্রিয়াকরণ, গবেষণা এবং উৎপাদন প্রচারের জন্য নিবেদিতপ্রাণ বিরল আর্থ করিডোর তৈরিতে সহায়তা করার প্রস্তাব করছি।’ নির্মলা সীতারামন বাজেটে ভারতের উচ্চ-গতির রেল উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন। বাজেটে সাতটি উচ্চ-গতির রেল করিডোরের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার লক্ষ্য হল টায়ার-২ এবং টায়ার-৩ শহরগুলিকে প্রধান নগর কেন্দ্রগুলির সাথে সংযুক্ত করা এবং সড়ক ও স্বল্প দূরত্বের বিমান ভ্রমণের একটি পরিষ্কার, দ্রুত বিকল্প হিসাবে রেলপথ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। বাজেটে পুনে-মুম্বাই, পুনে-হায়দরাবাদ, হায়দরাবাদ-বেঙ্গালুরু, বেঙ্গালুরু-চেন্নাই, হায়দরাবাদ-চেন্নাই, দিল্লি-বারাণসী এবং বারাণসী-শিলিগুড়ি রুটগুলিকে বৃদ্ধি সংযোগকারী হিসাবে বিকশিত করা হবে এবং এখানে রেল করিডোর তৈরি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একসাথে, এই করিডোরগুলি পশ্চিম, দক্ষিণ, উত্তর এবং পূর্ব অঞ্চলগুলিকে সংযুক্ত করে, শিল্প কেন্দ্র, প্রযুক্তি কেন্দ্র, তীর্থস্থান শহর এবং উদীয়মান নগর ক্লাস্টারগুলিকে একটি দ্রুত, আরও সমন্বিত নেটওয়ার্কে একত্রিত করে। অর্থমন্ত্রী আরও ঘোষণা করেন যে দুর্গাপুরকে উত্তর-পূর্ব শিল্প করিডোরের সাথে সংযুক্ত করা হবে।
পেশাদারী শিক্ষার উপরে গুরুত্ব
নির্মলা সীতারামন বলেন যে সরকার স্বল্পমেয়াদী মডুলার কোর্স ডিজাইনে আইসিএআই এবং আইসিএসআই-এর মতো পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলিকে সহায়তা করার প্রস্তাব করছে। তিনি বলেন যে বেসরকারি সহায়তায় পাঁচটি মেডিকেল হাব তৈরি করা হবে। ভারতজুড়ে তিনটি নতুন অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠা করা হবে। চিকিৎসা পর্যটনের জন্য পরিকাঠামো তৈরি করা হবে। তিনি বলেন যে পূর্ব ভারতে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট ফর ডিজাইন প্রতিষ্ঠা করা হবে। উচ্চশিক্ষায় মহিলাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর জন্য, প্রতিটি জেলায় মহিলা হোস্টেল তৈরি করা হবে।
দুর্গাপুরে নতুন শিল্প করিডর
পূর্ব ভারত ও উত্তর-পূর্ব ভারতের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে বাজেটের মূল অগ্রাধিকারে তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। তিনি ঘোষণা করেন, পূর্বাঞ্চলের শিল্প, পরিবহণ ও পর্যটন পরিকাঠামোকে নতুন গতি দিতে একাধিক বৃহৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে দুর্গাপুরকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হবে একটি নতুন শিল্প করিডর, যা ‘ইন্টিগ্রেটেড ইস্ট-কোস্ট করিডর’-এর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পূর্ব ভারতের শিল্প সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এই করিডর উৎপাদন, লজিস্টিক্স ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নেবে। দুর্গাপুরের ঐতিহ্যবাহী শিল্প পরিকাঠামো এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে সামনে রেখে এই অঞ্চলকে শিল্প মানচিত্রে আরও শক্তপোক্ত জায়গা করে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্র। একই সঙ্গে পূর্ব ভারতের পাঁচটি রাজ্যে পাঁচটি নতুন পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার ঘোষণাও করা হয়েছে। পর্যটনকে আরও পরিবেশবান্ধব করতে প্রায় ৪ হাজার ইলেকট্রিক বাস চালু করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কী কী সস্তা হচ্ছে?
এবার বাজেটে দাম কমছে ক্যানসার ও সুগারের মতো জরুরি ওষুধ সহ মোট ১৭ জীবনদায়ী জরুরি ওষুধের। দাম কমছে খেলাধুলার সরঞ্জাম, চামড়াজাত পণ্যের। বৈদ্যুতিক ব্যাটারি সস্তা হওয়ায় দাম কমছে বৈদ্যুতিক যানবাহন যেমন ইলেক্ট্রিক স্কুটার, গাড়ি ইত্যাদির। দাম কমছে ভারতে তৈরি স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেটের। সস্তা হচ্ছে সৌর প্যানেল, মাইক্রোওভেন
দাম বাড়ছে কিসের?
এবার বাজেটে সুরাপ্রেমীদের জন্য দুঃসংবাদ। এবার বাজেটে দাম বাড়ছে মদের। জিএসটি হার সংশোধনের সময়ই মদ ও বিলাসবহুল সামগ্রীর উপর ‘সিন ট্যাক্স’ আরোপের ঘোষণা করা হয়েছিল। এবার বাজেটেও রইল তার স্পষ্ট ঘোষণা। দাম বাড়ছে মদ ও সিগারেটের। দাম বাড়ছে পানমশলা ও গুটখার। একইসঙ্গে দাম বাড়ছে খনিজ দ্রব্যের। লোহা, কয়লা, নুন প্রভৃতি খনিজের দাম বাড়ছে।
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের পাশে কেন্দ্র
কেন্দ্রীয় বাজেটে বড় সুখবর দেশের ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটারদের জন্য। এখন অনেকেই অ্যানিমেশন, গেমিং সহ এই ধরনের নানা বিষয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েট করে অর্থ রোজগার করেন। তাদের কথা মাথায় রেখে বাজেটে বিশেষ ঘোষণা করা হল। সংসদে এদিন কেন্দ্রীয় বাজেটে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ঘোষণা করেন, দেশের ১৫ হাজারটি মাধ্যমিক স্কুল ও ৫০০টি কলেজে এভিজিসি বা অ্যানিমেশন, ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস, গেমিং ও কমিক্স কনটেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব স্থাপনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার সহায়তা করবে। নির্মলা এই উদ্যোগটি মূলত ‘অরেঞ্জ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল শিল্পক্ষেত্রকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। মুম্বইয়ের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিসের সহযোগিতায় এই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির দক্ষতা বাড়ানো, অ্যানিমেশন, গেমিং, ভিএফএক্স ও কমিক্স শিল্পে ক্রমবর্ধমান দক্ষ জনবলের চাহিদা পূরণ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই লক্ষ্য। অনুমান করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই ক্ষেত্রগুলিতে প্রায় ২০ লক্ষ পেশাদার কর্মীর প্রয়োজন হবে।
মহিলাদের জন্য বড় ঘোষণা বাজেটে
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা, ১৬ হাজার নতুন সেকেন্ডারি স্কুল থেকে প্রতি জেলায় মহিলাদের হস্টেল তৈরি হবে। পাশাপাশি স্বনির্ভর ভারতের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ। অতিরিক্তভাবে, আয়কর ফর্মগুলি সরলীকৃত করা হবে। নতুন আইনটি পয়লা এপ্রিল, ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। সংশোধিত আইটিআর ৩১ মার্চ পর্যন্ত দাখিল করা যাবে। এদিন বাজেটে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দুগ্ধ ও হাঁস-মুরগি পালনকে শক্তিশালী করতে চাই। আমরা কৃষিক্ষেত্রে পণ্য পেতে পারি। আমরা পণ্যের বৈচিত্র্য প্রসারিত করতে চাই। আমরা নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারি। চন্দন, নারকেল এবং কাজু ভালো আয় করে। আমরা উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে বাদাম এবং চিনাবাদাম প্রচার করতে চাই।’

বাড়তি গুরুত্ব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বাজেটে বড় ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তিনি একটি প্যানেল গঠনের প্রস্তাব করেছেন বাজেটে। এই প্যানেল সার্ভিস সেক্টরের উপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-র প্রভাব পর্যালোচনা করবে। বাজেটের আগে সংসদে পেশ হওয়া আর্থিক সমীক্ষায় এআই নিয়ে আশার কথা যেমন শোনানো হয়েছে, তেমনি কিছুটা আশঙ্কার কথাও শোনানো হয়েছে। তাই বিশ্বের অন্য দেশের সঙ্গে এগিয়ে যেতে এআই নিয়ে যে নির্মলা বাজেটে কিছু ঘোষণা করবেন, তা একপ্রকাশ আশা করা হয়েছিল।