শৌনক মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে এখন প্রতিটি চালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধের সম্ভাবনা। একদিকে United States, অন্যদিকে Israel এবং Iran—মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত অক্ষ। আর এই উত্তাপের মধ্যেই নীরবে, কিন্তু দৃঢ় পায়ে নিজের শক্তির প্রদর্শন করছে India।
২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার সূচক অনুযায়ী ভারত এখন বিশ্বের চতুর্থ শক্তিশালী সামরিক দেশ। সূচকে ভারতের PowerIndex স্কোর ০.১৩৪৬। তালিকার শীর্ষে আমেরিকা, ১৫ নম্বরে ইজরায়েল, ১৬ নম্বরে ইরান। এই র্যাঙ্কিং শুধু সংখ্যার খেলা নয়—এটি ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতির দিকনির্দেশ।
বাজেটেই বার্তা: ১০৯ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা শক্তি
ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট এখন প্রায় ১০৯ বিলিয়ন ডলার। তুলনায় আমেরিকার বাজেট আকাশছোঁয়া—৮৩১.৫ বিলিয়ন ডলার। ইজরায়েল ব্যয় করছে ৩৪.৬ বিলিয়ন, ইরান মাত্র ৯.২৩ বিলিয়ন ডলার।
তবে শুধুই টাকার অঙ্কে শক্তি মাপা যায় না। ভারতের কৌশল স্পষ্ট—“স্মার্ট পাওয়ার”। আধুনিকীকরণ, দেশীয় উৎপাদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ প্রস্তুতি—এই ত্রয়ী নীতিতেই এগোচ্ছে দিল্লি। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রতিরক্ষা প্রকল্প এখন শুধু স্লোগান নয়, বাস্তব শক্তি।
১৪.৩ লাখ সক্রিয় সেনা, সঙ্গে ১০ লাখ রিজার্ভ
ভারতের সক্রিয় সামরিক কর্মীর সংখ্যা ১৪.৩ লাখ। সঙ্গে প্রায় ১০ লাখ রিজার্ভ ফোর্স। সংখ্যার নিরিখে এটি বিশ্বের বৃহত্তম বাহিনীগুলির একটি।
তুলনায় আমেরিকার মোট সক্রিয় সেনা প্রায় ২১ লাখের বেশি। ইজরায়েলের ৬.৬৯ লাখ এবং ইরানের ১১.৮ লাখ। কিন্তু ভারতের ভৌগোলিক বাস্তবতা আলাদা—উত্তরে পাহাড়ি সীমান্ত, পশ্চিমে মরু, পূর্বে জঙ্গল, দক্ষিণে বিস্তৃত সমুদ্রসীমা। এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে যে পরিকাঠামো দরকার, ভারত তা তৈরি করেছে।
স্থলবাহিনীতে শক্ত ভিত
ভারতের কাছে রয়েছে ৩,৯১৩টি ট্যাঙ্ক এবং প্রায় ১.৬৩ লক্ষ সাঁজোয়া যান। আর্টিলারি ও রকেট সিস্টেমের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে।
আমেরিকার ট্যাঙ্ক সংখ্যা ৪,৬৬৬—বিশ্বে সর্বোচ্চদের মধ্যে। ইরানের ২,৬৭৫, ইজরায়েলের ১,৩০০। তবে ভারতের কৌশলগত অবস্থান—দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মাঝে—এই সাঁজোয়া শক্তিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
লাদাখ থেকে রাজস্থানের মরু—প্রতিটি সীমান্তে দ্রুত মোতায়েন সক্ষমতা এখন ভারতের বড় সম্পদ।
আকাশে ২,১৮৩ যুদ্ধবিমান: নজরদারিতে অদম্য
ভারতের বিমান শক্তি ২,১৮৩টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে ৪৭৬টি ফাইটার জেট। ট্রান্সপোর্ট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, নজরদারি প্ল্যাটফর্ম—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ এয়ার ডমিন্যান্স কাঠামো।
তুলনায় আমেরিকার ১৩,০৩২টি বিমান, যার মধ্যে ১,৭৯১টি ফাইটার। ইজরায়েলের ৫৯৭ এবং ইরানের ৫৫১।
ভারতীয় বায়ুসেনা এখন শুধু প্রতিরক্ষায় নয়, প্রয়োজনে দূরপাল্লার আঘাত হানতেও প্রস্তুত। আকাশসীমা রক্ষা থেকে শুরু করে কৌশলগত হামলা—দুই ক্ষেত্রেই প্রস্তুতি রয়েছে।
নৌবাহিনী: ভারত মহাসাগরে অদৃশ্য আধিপত্য
ভারতের নৌবহরে রয়েছে ৩৪৩টি যুদ্ধজাহাজ, ১৮টি সাবমেরিন এবং ২১টি করভেট। ভারত মহাসাগর অঞ্চলে এই শক্তি কার্যত ভারসাম্য নির্ধারণ করে।
আমেরিকার নৌবহর বিশাল—৪৬৫টি জাহাজ, ৬৬টি সাবমেরিন। ইরানের ১০৯ এবং ইজরায়েলের ৮২।
কিন্তু ভারতের ভৌগোলিক সুবিধা আলাদা। আন্দামান-নিকোবর থেকে আরব সাগর—ভারতের নজরদারি পরিধি বিশাল। ভারত মহাসাগর দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ জাহাজ চলাচল করে। এই রুটে দিল্লির উপস্থিতি কৌশলগতভাবে অমূল্য।
পারমাণবিক সক্ষমতা: নীরব কিন্তু নির্ণায়ক
ভারত একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। স্থল, জল এবং আকাশ—তিন মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র বহনের ক্ষমতা রয়েছে। এই “নিউক্লিয়ার ট্রায়াড”ই ভারতের আসল কৌশলগত ঢাল।
আমেরিকা বহু দশক ধরেই এই ক্ষেত্রে শীর্ষে। ইজরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও পারমাণবিক সক্ষম বলে মনে করা হয়। ইরান এখনও বিতর্কের কেন্দ্রে।
ভারতের নীতি স্পষ্ট—“নো ফার্স্ট ইউজ”। অর্থাৎ আগে আঘাত নয়, কিন্তু আঘাত এলে জবাব হবে চূড়ান্ত।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ, ভারতের ঠান্ডা মাথা
মধ্যপ্রাচ্যে যখন উত্তেজনা তুঙ্গে, তখন ভারত কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করছে। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে জ্বালানি ও চাবাহার বন্দর প্রকল্পে সম্পর্ক, পাশাপাশি ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা—এই বহুমুখী কূটনীতি ভারতের শক্তি বাড়িয়েছে।
এই ভারসাম্যই দিল্লিকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। শুধু সামরিক শক্তি নয়, কূটনৈতিক দক্ষতাও ভারতের বড় সম্পদ।
চতুর্থ স্থানে ভারত: বার্তা স্পষ্ট
বিশ্বের সামরিক মানচিত্রে চতুর্থ স্থানে উঠে আসা নিছক গর্বের বিষয় নয়—এটি দায়িত্বও বটে। দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা রক্ষা, ভারত মহাসাগরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক শান্তিরক্ষায় ভূমিকা—সব ক্ষেত্রেই ভারতের প্রত্যাশা বাড়ছে।
আমেরিকা এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ইজরায়েল প্রযুক্তিতে এগিয়ে। ইরান আঞ্চলিক কৌশলে শক্ত। কিন্তু ভারত—সংখ্যা, প্রযুক্তি, কৌশল এবং পারমাণবিক সক্ষমতার মিলিত রূপ—এক নতুন শক্তির প্রতীক।
আজকের বিশ্বে শক্তি মানেই শুধু অস্ত্র নয়; শক্তি মানে প্রস্তুতি, স্থিতিশীলতা এবং কৌশল। সেই পরীক্ষায় ভারত এখন দৃঢ়ভাবে উত্তীর্ণ।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল আবহে যখন বিশ্ব তাকিয়ে আছে ওয়াশিংটন, তেল আভিভ ও তেহরানের দিকে, তখন নীরবে দিল্লি জানিয়ে দিচ্ছে—চতুর্থ স্থানে নয়, আগামী দিনে আরও ওপরে উঠতে প্রস্তুত ভারত।
বিশ্বরাজনীতির এই নতুন অধ্যায়ে, ভারতের সামরিক শক্তি শুধু প্রতিরক্ষা নয়—এটি এক আত্মবিশ্বাসী জাতির ঘোষণা।