কনিষ্ক সামন্ত। কলকাতা সারাদিন।
একুশের বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম থেকে নিজে প্রার্থী হয়ে কার্যত বাংলার ২৯৪ কেন্দ্রের ভোটের অভিমুখ পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন।
নন্দীগ্রামে মমতা বনাম শুভেন্দু লড়াই গোটা দেশ জুড়ে এতখানি সাড়া ফেলেছিল যে শুভেন্দু অধিকারী তো দূরের কথা গোটা বিজেপিকেই ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল নন্দীগ্রাম তথা পূর্ব মেদিনীপুরের ভোট নিয়ে। আর সেই সুযোগে ভাঙ্গা পায়ে বাংলার ২৯৪ কেন্দ্রের মধ্যে অধিকাংশতেই ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছিলেন মমতা।
শুভেন্দু যতক্ষণে মমতার এই স্ট্রাটেজি বুঝতে পেরেছিলেন ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। শুভেন্দুর কাছে লোডশেডিং হোক অথবা অন্য কোনো কারণে মমতা 1956 ভোটে হেরে গেলেও বাংলার ক্ষমতায় বিজেপির আর আসা হয়ে ওঠো নি। এবারে তাই মমতার অস্ত্রে মমতাকে বধ করার জন্য তাকে ভবানীপুরে আটকে দেওয়ার ছক কষে শুভেন্দু অধিকারী অমিত শাহ এবং নরেন্দ্র মোদীকে বহু বুঝিয়ে প্রার্থী হয়েছেন নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে। তার উদ্দেশ্য ছিল মমতা ভবানী করে শুভেন্দু কে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে গিয়ে বাংলার অন্যত্র বেশি ছুটতে পারবেন না।
কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে বুঝে ওঠা এখনো দুষ্কর শুভেন্দুর পক্ষে। প্রার্থী ঘোষণার দিন সকালেই শুভেন্দুর নিজের ঘরে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেন্দুর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিলেন। ২০২০ সাল থেকে নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর নন্দীগ্রাম দূর্গ রক্ষার প্রধান সেনাপতি পবিত্র করকে। ছোটখাটো চেহারার পবিত্র কে দেখে বিজেপির বাংলা বা কেন্দ্রীয় স্তরের নেতারা এমনকি তৃণমূলের বহু নেতা নেত্রী বা কর্মী নাক সিঁটকোলেও এবারে কিন্তু জায়ান্ট কিলার হয়ে উঠতে পারেন পবিত্র কর।
নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লকের বয়াল অঞ্চলের নেতা পবিত্র। এক সময়ে তিনি তৃণমূল করতেন। ২০২০ সালে শুভেন্দুর পিঠোপিঠি সময়েই তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী বিজেপির টিকিটে জেতা পঞ্চায়েত প্রধান। তৃণমূলের বক্তব্য, নন্দীগ্রামে যে তিন নেতার উপর শুভেন্দু ভরসা করতেন, তাঁদের মধ্যে পবিত্র অন্যতম। তৃণমূল দেখাতে চাইছে তারা শুভেন্দুর ঘর ভেঙেছে!
একটা সময়ে ‘হিন্দু সংহতি’ নামে একটি ধর্মীয় সংগঠন করতেন পবিত্র। পরবর্তীতে ‘সনাতনী সেনা’ নামেও একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। গত নির্বাচন থেকেই নন্দীগ্রামে ধর্মীয় মেরুকরণ প্রকট। নন্দীগ্রাম ১ নম্বর ব্লকে যেমন সংখ্যালঘুদের আধিপত্য, তেমনই ২ নম্বর ব্লকে হিন্দু ভোটারেরাই নিয়ন্ত্রক। গত বিধানসভায় বয়াল ১ এবং ২ নম্বর অঞ্চল থেকেই সবচেয়ে বেশি ভোটে এগিয়ে ছিলেন শুভেন্দু। যেখানে জাদুকাঠির কাজ করেছিল হিন্দু ভোট। এ বার সেই বয়াল থেকেই এক জন হিন্দু মুখকে বিজেপি থেকে এনে প্রার্থী করল তৃণমূল। যাঁর পরিচিতির সঙ্গে জুড়ে রয়েছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের অতীতও। তৃণমূলের অনেকের বক্তব্য, ১ নম্বর ব্লকের সংখ্যালঘুদের ভোট জোড়াফুল চিহ্নেই আসবে। কিন্তু ২ নম্বর ব্লকে হিন্দু ভোটে চিড় ধরাতে পারলে হিসাব অন্য রকম হয়ে যেতে পারে।
গত পাঁচ বছরের নন্দীগ্রামের রাজনীতির দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, এই জনপদে হিন্দুত্বের হিল্লোল চলেছে। বিরোধী দলনেতা নিজেই অজস্র ধর্মীয় কর্মসূচিতে হাজির ছিলেন। গত জানুয়ারি মাসে রামন্দির প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় বর্ষ উদ্যাপনে গোটা নন্দীগ্রাম জুড়ে যে পরিমাণ গেরুয়া পতাকা এবং হনুমানের ছবি ঝোলানো হয়েছিল, তা চোখে পড়ার মতো।

প্রার্থিপদ ঘোষণা হওয়ার পরেই নন্দীগ্রামে প্রচারে বেরিয়ে পড়েছেন পবিত্র। তৃণমূলের তমলুক সাংগঠনিক জেলা সভাপতি সুজিত রায়ের সঙ্গে চষে বেড়াচ্ছেন নন্দীগ্রামের বিভিন্ন এলাকা। তাঁরও দাবি, এ বার নন্দীগ্রামে ভিন্ন ছবি দেখা যেতে চলেছে।