সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
ভোটের দামামা বাজতেই ফের নগদ টাকার প্রবাহ নিয়ে প্রশ্ন উঠল বাংলায়। আলিপুরদুয়ার জেলার অসম সীমান্তে রাজ্য পুলিশের নাকা চেকিংয়ে আটক হল একটি গাড়ি, আর সেই গাড়ি থেকেই উদ্ধার হল বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা। ঘটনাকে ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মহলে, বিশেষ করে ভোটের মুখে এই ধরনের উদ্ধার নতুন করে জল্পনা বাড়িয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। সেই নজরদারির অংশ হিসেবেই আলিপুরদুয়ার-অসম সীমান্তে নিয়মিত নাকা চেকিং চলছিল। মঙ্গলবার একটি অসম নম্বর প্লেটযুক্ত গাড়িকে সন্দেহজনক মনে হওয়ায় সেটিকে থামিয়ে তল্লাশি শুরু করেন পুলিশকর্মীরা।
তল্লাশির সময়ই গাড়ির বিভিন্ন অংশ থেকে একের পর এক নোটের বান্ডিল উদ্ধার হতে থাকে। মূলত ৫০০ এবং ১০০ টাকার নোটে ভরা ওই নগদের পরিমাণ প্রথমে কয়েক লক্ষ টাকা বলে অনুমান করা হয়। প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা গণনা করা হয়েছে, তবে পুরো অঙ্ক আরও বেশি হতে পারে বলেই মনে করছে পুলিশ।
গাড়ির মালিক হিসেবে যাঁর নাম সামনে এসেছে, তিনি অসমের বাসিন্দা বিকেন ঈশ্বরারি। পেশায় রেশন ডিলার এবং সুপারি ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত বলে জানা গিয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, ব্যবসার কাজে প্রায়ই আলিপুরদুয়ার আসেন এবং কেনাকাটার সুবিধার জন্যই তিনি নগদ টাকা নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর কথায়, “এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক লেনদেনের টাকা।”
তবে পুলিশের তরফে এই ব্যাখ্যা সহজে মেনে নেওয়া হচ্ছে না। ভোটের ঠিক আগে এত পরিমাণ নগদ টাকা নিয়ে সীমান্ত পেরনোর ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং টাকার উৎস ও গন্তব্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রশাসনিক মহলে আরও একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—যেখানে অসমেও একই সময়ে বিধানসভা নির্বাচন চলছে, সেখানে এত বড় অঙ্কের নগদ টাকা নিয়ে একটি গাড়ি কীভাবে সহজেই সীমান্ত পার হয়ে এল? অসম পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে চাপানউতোর। শাসক দল বরাবরই অভিযোগ করে আসছে, নির্বাচনের আগে বাইরের রাজ্য থেকে অবৈধ টাকা ঢুকিয়ে ভোটে প্রভাব ফেলতে চায় বিরোধীরা। এই ঘটনার পর সেই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবির অবশ্য পুরো বিষয়টিকে প্রশাসনিক অতিরঞ্জন বলেই দাবি করতে পারে—এমনই ইঙ্গিত মিলছে। তাদের মতে, ব্যবসায়িক কারণে নগদ বহন করা অস্বাভাবিক নয়, এবং প্রতিটি ঘটনাকে রাজনৈতিক রং দেওয়া ঠিক নয়।
তবে বাস্তবতা হল, নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারির মধ্যেই এই ধরনের নগদ উদ্ধারের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি করে। অতীতে একাধিকবার ভোটের আগে বিপুল টাকা, মদ বা উপহার সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে, যা ভোটার প্রভাবিত করার প্রচেষ্টার অংশ বলেই অভিযোগ উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে আলিপুরদুয়ারের ঘটনা নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছে প্রশাসনকে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে নজরদারি আরও বাড়ানো হতে পারে বলেই ইঙ্গিত মিলছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলির কার্যকলাপের উপরও নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠছে।

সব মিলিয়ে, ভোটের আগে নগদ উদ্ধার ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আগামী দিনে বাংলার নির্বাচনী রাজনীতিতে আরও উত্তাপ বাড়াবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই ঘটনা শুধু একটি আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেরও ইঙ্গিত বহন ।