সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
তীব্র দাবদাহে জঙ্গল ছেড়ে জলাশয়ে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, সুন্দরবনে বিরল দৃশ্য দেখে উচ্ছ্বসিত পর্যটকেরা
সুধন্যখালির মিষ্টি জলের পুকুরে জল পান করতে দেখা গেল বাঘকে, ক্যামেরাবন্দি হতেই ছড়াল চাঞ্চল্য
সুন্দরবনে বাঘ দেখা অনেকের কাছেই যেন ভাগ্যের ব্যাপার।
কেউ বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও পান না দেখা, আবার কেউ হঠাৎ করেই সাক্ষী হয়ে যান এমন এক মুহূর্তের, যা সারাজীবনের স্মৃতি হয়ে থেকে যায়। সোমবার সুন্দরবনের সুধন্যখালিতে ঠিক তেমনই এক বিরল দৃশ্যের সাক্ষী থাকলেন কয়েকজন পর্যটক।
দুপুরের তীব্র গরমে ম্যানগ্রোভ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে মিষ্টি জলের পুকুরে জল পান করতে দেখা গেল একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে। আর সেই দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যেই ধরা পড়ে পর্যটকদের ক্যামেরায়।
স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গোটা লঞ্চে।
ঘটনাটি ঘটেছে সুন্দরবনের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সুধন্যখালি ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন এলাকায়। সোমবার দুপুরে কয়েকজন পর্যটক জলপথে লঞ্চে করে সেখানে পৌঁছন। সেই সময় আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত গরম ও আর্দ্র। দীর্ঘ কয়েকদিন ধরেই দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে তাপমাত্রার পারদ ঊর্ধ্বমুখী। তার প্রভাব পড়েছে সুন্দরবনের জঙ্গলেও।
ওয়াচ টাওয়ারে উঠে পর্যটকেরা যখন ম্যানগ্রোভের বিস্তীর্ণ সবুজ দেখছিলেন, ঠিক তখনই জঙ্গল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে একটি পূর্ণবয়স্ক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। কিছুটা সতর্ক ভঙ্গিতে চারপাশ দেখে নিয়ে সে সোজা এগিয়ে যায় ফরেস্ট ক্যাম্প সংলগ্ন মিষ্টি জলের পুকুরের দিকে।
এরপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে জল পান করতে দেখা যায় তাকে।
পর্যটকদের একাংশ জানান, এত কাছ থেকে বাঘকে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁদের জীবনে প্রথম। কেউ মোবাইলে ভিডিও তুলেছেন, কেউ আবার ক্যামেরাবন্দি করেছেন সেই মুহূর্ত। অনেকেই উত্তেজনায় চিৎকার করে ফেললেও বনকর্মীরা দ্রুত সবাইকে শান্ত থাকতে বলেন।
সুন্দরবনের বনকর্মীদের একাংশের মতে, এই সময় জঙ্গলে গরম অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীরা প্রায়ই জলের খোঁজে গভীর জঙ্গল ছেড়ে তুলনামূলক খোলা এলাকায় চলে আসছে। বিশেষ করে সুধন্যখালির মতো এলাকায় যেখানে মিষ্টি জলের সংরক্ষণ করা হয়, সেখানে হরিণ, বুনো শূকর, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এবং মাঝে মধ্যেই বাঘও আসে জল পান করতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের ভৌগোলিক অবস্থান এবং নোনা জলের প্রভাবের কারণে মিষ্টি জলের উৎস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রীষ্মকালে জলাভাব বাড়লে বন্যপ্রাণীদের আচরণেও পরিবর্তন দেখা যায়। ফলে এমন দৃশ্য এখন তুলনামূলক বেশি চোখে পড়ছে।
তবে পর্যটকদের কাছে এই দৃশ্য নিঃসন্দেহে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করেছে। কারণ সুন্দরবনে ঘুরতে এসে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের দেখা পাওয়া এখনও অনেকের কাছেই বড় প্রাপ্তি। স্থানীয়দের কথায়, “বাঘের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।”
সুন্দরবনের পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্তদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটকদের মধ্যে আবার সুন্দরবন নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বাঘের ভিডিও বা ছবি ভাইরাল হওয়ার পর বহু মানুষ নতুন করে সুন্দরবন ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন।
যদিও বন দফতর বারবার সতর্ক করছে, বন্যপ্রাণীর খুব কাছে যাওয়ার চেষ্টা বা অতিরিক্ত শব্দ করা বিপজ্জনক হতে পারে। পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং প্রাণীদের স্বাভাবিক আচরণ বজায় রাখতে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই ভ্রমণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশবিদদের একাংশ অবশ্য এই ঘটনার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও দেখছেন। তাঁদের মতে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা শুধু মানুষের জীবনেই নয়, সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রেও বড় প্রভাব ফেলছে। জলের খোঁজে বন্যপ্রাণীদের জঙ্গল ছেড়ে বাইরে চলে আসা সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত।
সব মিলিয়ে, সুধন্যখালির এই দৃশ্য একদিকে যেমন পর্যটকদের কাছে রোমাঞ্চের, তেমনই তা সুন্দরবনের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীদের বর্তমান পরিস্থিতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
এখন প্রশ্ন, আগামী দিনে বাড়তে থাকা গরমে সুন্দরবনের প্রাণীকুলের আচরণে আরও বড় পরিবর্তন কি দেখা যাবে?