সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
‘নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস থেকে শুরু করে সিবিএসই পরীক্ষার একের পর এক অনিয়ম, আর এখন এসএসসি জিডি নিয়োগের কেলেঙ্কারি – ভারতের যুবসমাজকে এক অন্তহীন উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা আর চরম প্রতারণার চক্রের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।’ নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং সিবিএসই-র খাতা মূল্যায়ন বিতর্ক নিয়ে দেশজুড়ে চলা ক্ষোভের মধ্যে এবারের কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং সিবিএসই-র খাতা মূল্যায়ন বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার যোগ হয়েছে স্টাফ সিলেকশন কমিশনের জেনারেল ডিউটি কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষার চরম বিশৃঙ্খলা।
কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপিকে তীব্র ভাষায় বিঁধলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ (Abhishek Banerjee attacks BJP government on exam scam)। তাঁর সাফ কথা, দেশজুড়ে কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলা করছে বিজেপি সরকার। মেধার এই ‘পদ্ধতিগত ধ্বংসলীলা’ ভারতের যুবসমাজ আর বরদাস্ত করবে না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি দীর্ঘ ও কড়া ভাষার পোস্টে দেশের তরুণ প্রজন্মের মানসিক যন্ত্রণা ও ক্ষোভের কথা তুলে ধরেছেন অভিষেক। তিনি লিখেছেন, “নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস থেকে শুরু করে সিবিএসই (CBSE) পরীক্ষার একের পর এক অনিয়ম, আর এখন এসএসসি জিডি (SSC GD) নিয়োগের কেলেঙ্কারি – ভারতের যুবসমাজকে এক অন্তহীন উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা আর চরম প্রতারণার চক্রের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।”
তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ডের মতে, দেশের কোটি কোটি ছাত্রছাত্রী নিজেদের জীবনের সোনালি সময়টা পড়াশোনার পিছনে উজাড় করে দেয়। দিনের পর দিন তারা ঘুম বিসর্জন দেয়, পরিবার জমি-জায়গা বা সম্বল বন্ধক রেখে পড়াশোনার জন্য সব উজাড় করে দেয়। মানসিক শান্তি ও পরিবারের প্রত্যাশাকে কাঁধে নিয়ে তারা শুধু এই আশাটুকু বুকে বাঁধে যে, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা নিজেদের একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে। কিন্তু বিনিময়ে এই দেশ তাদের কী দিচ্ছে?
অভিষেকের কথায়, “পরিশ্রমের পুরস্কার হিসেবে যুবসমাজ আজ কী পাচ্ছে? শুধু প্রশ্ন ফাঁস, যান্ত্রিক ত্রুটি, চরম অব্যবস্থা, গাদাগাদি ভিড়ে ঠাসা পরীক্ষা কেন্দ্র আর এক ভেঙে পড়া সিস্টেম!”
এসএসসি জিডি (SSC GD) পরীক্ষার সাম্প্রতিক গোলমালের কথা উল্লেখ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লিখেছেন, এবার প্রায় ৪৬ লক্ষ পরীক্ষার্থী এই কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে একটা বিশাল অংশ প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান, যাঁরা ধারদেনা করে, পকেটে সামান্য কিছু টাকা নিয়ে চোখের স্বপ্ন পূরণের জন্য শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন। এই পরীক্ষার্থীদের ন্যূনতম মর্যাদা এবং একটা স্বচ্ছ ও ন্যায্য পরীক্ষা পাওয়ার অধিকার ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
অভিষেক অভিযোগ করেছেন, “পরীক্ষা কেন্দ্রগুলিতে সার্ভার ডাউন হয়ে যাওয়া, চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুতর খামতি থাকার যে সমস্ত রিপোর্ট সামনে আসছে, তা পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর থেকে আমজনতার বিশ্বাসকে আরও একবার পুরোপুরি নাড়িয়ে দিয়েছে।”
কেন্দ্রীয় সরকারকে কাঠগড়ায় তুলে অভিষেক দাবি করেছেন, দেশের এই পরিস্থিতিকে কোনওভাবেই শুধুমাত্র ‘অব্যবস্থা’ বা ‘ম্যানেজমেন্টের অভাব’ বলে লঘু করা যায় না। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “এটা স্রেফ অব্যবস্থা নয়, এটা হল সুপরিকল্পিতভাবে মেধার গলা টিপে হত্যা করা।”
তৃণমূল সাংসদের উদ্বেগ, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের একটা গোটা প্রজন্ম এই ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছে যে, তারা যতই কঠোর পরিশ্রম করুক না কেন, এই মেরুদণ্ডহীন সিস্টেমটি মাত্র এক রাতের মধ্যেই তাদের সমস্ত স্বপ্ন তছনছ করে দিতে পারে।
বিজেপি জমানাকে তীব্র আক্রমণ করে তিনি তোপ দাগেন, “ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) শাসনে আজ পরীক্ষাগুলো দেশ গড়ার বা তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করার হাতিয়ার হচ্ছে না, বরং স্ক্যাম ও জালিয়াতির কারণে সংবাদ শিরোনামে জায়গা করে নিচ্ছে। নিট (NEET) পরীক্ষা সিস্টেমের ভেতরের ফাটলগুলোকে সবার সামনে এনে দিয়েছিল। আর এখন একটার পর একটা সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে এই পুরো ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঠিক কতটা পচন ধরেছে।” অভিষেকের কথায়, এ দেশের পড়ুয়ারা সরকারের কাছে কোনও বাড়তি সুযোগ বা দাক্ষিণ্য ভিক্ষা করছে না, তারা শুধু একটা সৎ, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ পরীক্ষা ব্যবস্থা চাইছে, যেখানে মেধার সঠিক মূল্যায়ন হবে।

কেন্দ্রের মোদী সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “যে সরকার দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থার ন্যূনতম সততা ও স্বচ্ছতা রক্ষা করতে পারে না, তারা কোন মুখে দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করার দাবি করে? ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই খেলা অবিলম্বে বন্ধ করুন। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে চালানো বন্ধ হোক। দেশের পাবলিক ইনস্টিটিউশন বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের যেটুকু বিশ্বাস অবশিষ্ট আছে, তা দয়া করে ধ্বংস করবেন না।”
কেন্দ্রের শাসকদলকে সতর্ক করে দিয়ে তৃণমূল নেতার শেষ সংযোজন, “এই দেশের যুবসমাজ কিন্তু সবকিছু গভীরভাবে লক্ষ্য করছে। আর সময় এলে তারা এ কথা ঠিক মনে রাখবে।”
তৃণমূলের এই আক্রমণের পর রাজনৈতিক মহল মনে করছে, আগামী সংসদ অধিবেশনে নিট এবং এসএসসি জিডি-র মতো বিষয়গুলি নিয়ে মোদী সরকারকে কোণঠাসা করার বড়সড় রণকৌশল তৈরি হচ্ছে অন্দরে।