মঙ্গলবারের ধরনার আগে লাইভে এসে তীব্র আক্রমণ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর। বিধায়কদের হুমকি, দল ভাঙার চাপ, কর্মসূচিতে বাধা—একের পর এক অভিযোগে সরগরম বাংলার রাজনীতি।
সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
কলকাতা: রাজ্যের রাজনৈতিক আবহাওয়া যখন ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে, ঠিক তখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভে এসে বিস্ফোরক অভিযোগের ঝাঁপি খুললেন তৃণমূল নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়, পরিকল্পিতভাবে তৃণমূল কংগ্রেসকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। আর সেই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রশাসন, পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে।
মঙ্গলবারের ঘোষিত ধরনা কর্মসূচির আগের দিন মমতার এই বক্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
লাইভ সম্প্রচারে মমতা সরাসরি অভিযোগ করেন, তৃণমূলের বিধায়ক ও নেতাদের ফোন করে ভয় দেখানো হচ্ছে। তাঁর কথায়, “প্রথম ফোনটা আসছে পুলিশের তরফে, আর দ্বিতীয় ফোনটা যাচ্ছে বিজেপির অফিস থেকে। বলা হচ্ছে দল ভাঙুন, অমুক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।”
এই অভিযোগ সামনে এনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এটাই কি গণতন্ত্রের নমুনা? রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের এভাবে চাপ দেওয়া কি স্বাভাবিক?”
শুধু বিধায়ক নন, সাধারণ কর্মীরাও চাপে রয়েছেন বলে দাবি করেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কর্মীদের মিছিল-মিটিং করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কোথাও অনুমতি মিলছে না, কোথাও আবার কর্মসূচির আগের মুহূর্তে স্থান বদলের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
মমতা বলেন, “আমাদের অসংখ্য পার্টি অফিস ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কর্মীদের মারধর করা হচ্ছে। বহু জায়গায় ভয় দেখিয়ে ঘরে বসিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।”
সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ আসে তৃণমূলের কয়েকজন বিধায়ককে ঘিরে। মমতার দাবি, তাঁরা তাঁকে জানিয়েছেন যে তৃণমূলের কর্মসূচিতে যোগ দিলে তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা, মাদক মামলা বা অন্য কোনও গুরুতর অভিযোগে ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “চারজন বিধায়ক আমাকে জানিয়েছেন, তাঁদের বলা হয়েছে যদি তৃণমূলের সভায় যান, তাহলে কেন্দ্রীয় সংস্থা দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা কি গণতান্ত্রিক রাজনীতি?”
বিজেপির বিরুদ্ধে আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে মমতার অভিযোগ, দল ভাঙাতে কখনও টাকা, কখনও তদন্তের ভয়, আবার কখনও পরিবারের উপর চাপ তৈরির কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরেও সরব হন তিনি। নাম না করে বিরোধীদের উদ্দেশে মমতা বলেন, “অভিষেককে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে। বাইরে থেকে লোক এনে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু মানুষ সব দেখছে।”
এদিনের লাইভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মঙ্গলবারের আন্দোলন নিয়ে তাঁর অবস্থান। রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে ধরনার জন্য অনুমতি চাওয়া হয়েছিল বলে জানান মমতা। তাঁর অভিযোগ, বহুদিন আগে আবেদন করা হলেও শেষ মুহূর্তে পুলিশ জানিয়ে দেয় সেখানে কর্মসূচি করা যাবে না।
এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “যেখানে পুলিশ আটকে দেবে, সেখানেই বসে পড়ব। মঞ্চ না হলে মঞ্চ নয়, মাইক না হলে মাইক নয়। আন্দোলন থামবে না।”
তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় চ্যালেঞ্জের সুরও। “গ্রেপ্তার করতে হলে করুন। মারলে মার খাব। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ করব না।”
তৃণমূল সূত্রে খবর, শেষ পর্যন্ত রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ের বদলে ওয়াই চ্যানেলে ধরনা কর্মসূচি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মমতার আশঙ্কা, কর্মসূচির দিন নেতাকর্মীদের রাস্তায় আটকে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।
তাই তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “কেউ না এলেও আমি একাই পথে নামব।”

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই বক্তব্য শুধু একটি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নয়, বরং আগামী দিনের বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের বার্তাও বহন করছে। ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতি, বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ—সবকিছুর উপরই এর প্রভাব পড়তে পারে।
এখন নজর মঙ্গলবারের দিকে। ওয়াই চ্যানেলের মঞ্চ থেকে কি আরও বড় রাজনৈতিক বার্তা দেবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? নাকি এই সংঘাত আরও নতুন মোড় নেবে? বাংলার রাজনীতিতে সেই উত্তর জানার অপেক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।