সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
ট্যাংরায় একই পরিবারের তিন জনের রহস্যমৃত্যু। ট্যাংরার ২৩/এ অতুল সুর রোডে একই পরিবারের দুই মহিলা এবং একজন কিশোরীর দেহ উদ্ধার।
ট্যাংরার ব্যবসায়ী পরিবারে দুই মহিলা এবং এক কিশোরীর দেহ উদ্ধারের ঘটনায় সামনে উঠে আসছে একাধিক প্রশ্ন। পুলিশের কাছে মৃত দুই মহিলার মধ্যে একজনের স্বামী দাবি করেছেন, পায়েসের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে প্রথমে খেয়েই আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তাঁরা। ট্যাংরার অতুল গুহ রোডের ওই বাড়ির দোতলার তিনটি আলাদা আলাদা ঘর থেকে দুই মহিলা এবং এক কিশোরীর দেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত দুই মহিলার হাতের শিরা কাটা ছিল। আবার একজনের গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতও ছিল বলে খবর। বাড়ি থেকে একটি ছুরিও উদ্ধার করেছে পুলিশ। মৃত নাবালিকার দেহে কোনও আঘাতের চিহ্ন ছিল না, তবে তার মুখ থেকে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছিল। অন্যদিকে বাড়িরই তিন পুরুষ সদস্য প্রসূন দে, প্রণয় দে এবং তাদের সঙ্গে থাকা ১৪ বছর বয়সি এক কিশোর এ দিন ভোরে ট্যাংরার ওই বাড়ি থেকে নিজেদের গাড়িতেই বেরিয়ে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই রুবি মোড়ের কাছে অভিষিক্তার কাছে মেট্রো রেলের পিলারে সজোরে ধাক্কা মারে ওই গাড়িটি। ইচ্ছাকৃত ভাবেই এই দুর্ঘটনা ঘটানো হয় বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন গাড়িতে থাকা দুই ভাই প্রণয় এবং প্রসূন দে। ট্যাংরার বাড়িতে পরিবারের তিন মহিলা সদস্যের দেহ পড়ে রয়েছে, দুর্ঘটনার পর তাঁরাই পুলিশকে সেকথা জানান।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই দুই ভাইয়ের অবস্থা স্থিতিশীলই রয়েছে বলে খবর। গাড়িতে থাকা কিশোরের আঘাতও গুরুতর নয়। আপাতত ওই দুই ভাইয়ের বয়ান সংগ্রহ করছে পুলিশ। যদিও আহত কিশোর অত্যন্ত আতঙ্কিত অবস্থায় রয়েছে। কোনও কথাই বলতে চাইছে না সে।
কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা বলেন, “কেন হল তার পুরো রিপোর্ট আমার কাছে নেই। তবে আর্থিক কারণে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। তবে পরিবারের মধ্যেই কিছু ইস্যু আছে।”
কলকাতা পুলিশের নগরপাল মনোজ ভার্মা জানিয়েছেন, আপাতত দুই ভাইয়ের বয়ানের সত্যতা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। তবে এই ঘটনা শুধুই আত্মহত্যা না কি অন্য রহস্য আছে তা এখনও বলার মতো সময় আসেননি বলে জানিয়েছেন নগরপাল। তবে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে তিনি জানিয়েছেন, তদন্তকারীদের হাতে আরও কিছু তথ্য উঠে এসেছে। যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। পাশাপাশি ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এলেও রহস্যের জট অনেকটা কাটবে। এর পাশাপাশি খতিয়ে দেখা হচ্ছে সিসিটিভি ফুটেজ। দুই ভাইকে জনকেই জিজ্ঞাসাবাদও চলছে। আহত ওই কিশোর অবশ্য ঘটনার অভিঘাতে এতটাই আতঙ্কিত যে তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হচ্ছে না। ওই বেসরকারি হাসপাতালের পক্ষ থেকে মনোবিদেরও সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। তবে ট্যাংরাকাণ্ডে যা যা তথ্য পুলিশ পেয়েছে, তার সবটা এখনও প্রকাশ্যে আনা হয়নি। সিপি বলেন, ”আরও কিছু তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। হাসপাতাল থেকে আহতেরা যা বয়ান দিয়েছেন, তা যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই আমরা সব তথ্য প্রকাশ করতে পারছি না। কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি।”
জানা গিয়েছে, মৃত তিনজনের মধ্যে রয়েছেন সুদেষ্ণা দে। তিনি আহত প্রণয় দে-র স্ত্রী। দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রণয়ই বড়। প্রণয়ের সঙ্গে তাঁর ১৪ বছর বয়সি ছেলেও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। প্রণয়ের ছোটভাই প্রসূনের স্ত্রী রোমি দে এবং তাঁর নাবালিকা কন্যার দেহও উদ্ধার করা হয়েছে ট্যাংরার বাড়ি থেকে। প্রসূন নিজেও আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
তবে এই ঘটনায় একাধিক প্রশ্ন সামনে আসছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, চারতলার তিনটি আলাদা আলাদা ঘর থেকে তিনটি দেহ উদ্ধার হয়। অথচ এক তলার ঘরেও মিলেছে রক্তের দাগ। ঘুুমের ওষুধ মেশানো পায়েস খেয়ে মৃত দুই মহিলা নিজেরাই নিজেদের হাতের শিরা কেটেছিলেন কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। আবার হাতের শিরা কাটলেও কীভাবে একজনের গলায় ধারাল অস্ত্রের আঘাত এল, সেই প্রশ্নও উঠছে। পুলিশ জানিয়েছে, আপাতত আহত দুই ভাইয়ের বয়ান নেওয়া হয়েছে। যদিও সেই বয়ানের সত্যতা যাচাইয়ে শুরু হয়েছে তদন্ত। ঘটনাস্থলে গিয়েছেন ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টরা, নিয়ে যাওয়া হয়েছে পুলিশ কুকুরও। পাশাপাশি খতিয়ে দেখা হচ্ছে সিসিটিভি ফুটেজও। পাশাপাশি, মৃতদেহগুলির ময়নাতদন্ত রিপোর্টের অপেক্ষাতেও রয়েছে পুলিশ। জানা গিয়েছে চারতলায় আলাদা আলাদা ঘরে তিনটি দেহ পড়েছিল। কিন্তু তিন তলার ঘরেও রক্তের দাগ মিলেছে। ফলে ট্যাংরার এই কাণ্ড নিছক আত্মহত্যা নাকি অন্য চক্রান্তও রয়েছে, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান রূপেশ কুমার স্পষ্টতই জানান, মধ্যরাত সাড়ে তিনটে নাগাদ একটি চারচাকা গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ওই দুর্ঘটনাতেই আহত হয়েছিলেন প্রণয় দে ও প্রসূণ দে। তাঁদের ঠিকানায় খোঁজ চালাতেই তাঁদের স্ত্রী-সহ মেয়ের দেহ উদ্ধার হয়। কিন্তু, খুন করে হত্যা, বাড়িতে ঢুকেই ওই মহিলাদের কেউ খুন করে নাকি আত্মহত্যা তা নিয়ে বাড়ছে রহস্য। যদিও কোনও সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ। জোর দেওয়া হচ্ছে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে।
পুলিশের কাছে আহত দুই ভাই দাবি করেছেন, আর্থিক সমস্যার কারণেই গোটা পরিবার নিজেদের শেষ করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওই পরিবার চামড়ার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তাঁরা। ফলে দেনার দায়েই এত বড় ঘটনা, না কি এর পিছনে অন্য রহস্য আছে, তা স্পষ্ট নয়। ওই পরিবার আর্থিক সমস্যায় রয়েছে, তা কোনও আঁচ পাননি পাড়া প্রতিবেশীরাও। এলাকায় মিশুকে এবং ভদ্র হিসেবেই পরিচিত ছিলেন দে পরিবারের সদস্যরা। অভিজাত পরিবারের এমন পরিণতি হতে পারে, কল্পনাও করতে পারছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা।
ট্যাংরায় একই পরিবারের ৩ জনের দেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর দাবি করলেন পরিবারের এক ব্যবসায়িক সহযোগী। এদিন আতুল সূর লেনে দে পরিবারের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে প্রণয় ও প্রসূনবাবুর দেওয়া চেকগুলি বাউন্স করছিল। এমনকী সোমবারও তাঁদের দেওয়া একটি চেক বাউন্স করে। এর পর তিনি বাড়িতে এলেও কারও দেখা পাননি। এমনকী কারখানায় গিয়েও দেখা পাওয়া যায়নি ২ ভাইয়ের।

ওই ব্যক্তি জানিয়েছেন, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২ ভাইয়ের কারখানায় চামড়া সরবরাহ করতেন তিনি। কিন্তু ক্রমশ তাদের টাকা মেটানোয় সমস্যা হতে থাকে। একের পর এক চেক বাউন্স হতে থাকে তাদের। এভাবে ২ ভাইয়ের কাছে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা পাওয়া হয়ে গিয়েছে তার। তিনি জানান, সম্প্রতি ২ ভাইয়ের তরফে তাঁকে একটি চেক দেওয়া হয়। সেই চেকটি জানুয়ারি মাসে ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁকে ফেব্রুয়ারি মাসে চেকটি জমা দিতে অনুরোধ করা হয় প্রসূনবাবুর তরফে। সোমবার তিনি ২.৫ লক্ষ টাকার চেকটি ব্যাঙ্কে জমা দিলে মঙ্গলবার জানতে পারেন সেটিও বাউন্স করেছে। এর পর তিনি দে পরিবারের বাড়িতে আসেন। কিন্তু ডাকাডাকি করে সাড়া পাননি। এর পর দে পরিবারের কারখানায় যান। সেখানে থাকেন তাঁদের এক আত্মীয়। তাঁকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বলেন, প্রসূন ও প্রণয়বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না তিনিও। এমনকী তাঁদের স্ত্রীদেরও মোবাইল ফোন বন্ধ।
তিনি বলেন, দে পরিবারের চামড়া রফতানির কারবার ভালোই চলছিল। ব্যবসায় ওঠা পড়া থাকেই। তাই বলে কেউ এরকম চরম পদক্ষেপ করতে পারে এটা ভাবতে পারছি না।