সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।
একতরফাভাবে হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিজের বক্তব্য শোনার জন্য মঞ্চের চারদিকে বসিয়ে রাখা নয়। বক্তব্য শুনতে আসা মানুষের বক্তব্য শুনে তাদের সমস্যা সমাধান করার জন্য রাজনৈতিক জনসভা বা নির্বাচনী জনসভাকে পরিণত করলেন দরবারে। ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে কার্যত নয়া ইতিহাস তৈরি করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
সেই সঙ্গে আলিপুরদুয়ারের চা বলয়ে জনসভা করে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ও বঙ্গ বিজেপি জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সভা থেকে তিনি বারবার তুলনা টানেন তৃণমূল ও বিজেপি শাসনের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে। অভিষেক বলেন, ‘আলিপুরদুয়ারের সাংসদ ও বিধায়ক সবাই বিজেপির। ২০১৯, ২০২১, ২০২৪, সব নির্বাচনে এখানে বিজেপি জিতেছে। কিন্তু তাতে কি রাজ্য সরকার লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা বন্ধ করেছে? না। এটাই বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে তফাৎ। আমরা কথা দিলে কথা রাখি।’ তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২২ সালে আলিপুরদুয়ারে এসে যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তার কিছু কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে, কিছু এখনও বাকি আছে। তবে রাজ্য সরকার কাজ করছে বলেই দাবি করেন তিনি। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে অভিষেক বলেন, ‘১০০ দিনের কাজের টাকা পাঁচ বছর ধরে বন্ধ করে রেখেছে কেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি হেরেছে বলেই টাকা বন্ধ। কিন্তু তৃণমূল হারলেও রাজ্য সরকারের প্রকল্প বন্ধ হয়নি।’
চা শ্রমিকদের ইপিএফ, মজুরি সহ বিভিন্ন সমস্যায় কেন্দ্র কোনও পদক্ষেপ করেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে বিজেপি সাংসদদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে অভিষেক বলেন, ‘আগে মানুষ সরকার বেছে নিত, এখন সরকার ভোটার বেছে নিচ্ছে। গোটা দেশে ১৫০০ রাজনৈতিক দল আছে, কিন্তু বিজেপিকে হারানোর ক্ষমতা শুধু তৃণমূলেরই আছে।’ তিনি দাবি করেন, বাংলায় বারবার বিজেপি সুযোগ পেলেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৪ সালের বন্যার সময় বিজেপি নেতাদের অনুপস্থিতি নিয়েও সরব হন অভিষেক। বলেন, ‘বন্যার সময় কেউ আসেনি। কলকাতা থেকে দিদি এসে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ঘরবাড়ি, রাস্তা সারানোর দায়িত্ব নিয়েছে রাজ্য সরকার।’ এসআইআর প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, এই প্রক্রিয়ার নামে মানুষকে হেনস্থা করা হচ্ছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে কটাক্ষ করে অভিষেক বলেন, ‘জীবিত মানুষকে মৃত দেখানো হচ্ছে। এর চেয়ে বড় জাদুকর আর কেউ নেই।’ ধর্মের নামে বিভাজনের রাজনীতি নিয়েও বিজেপিকে নিশানা করেন তিনি। বলেন, ‘আমার ধর্ম কাউকে আক্রমণ করতে শেখায় না। সবচেয়ে বড় ধর্ম মানবতা। বিজেপি ক্ষমতায় এলে কী খাবেন, কী পড়বেন সেটাও ঠিক করে দেবে, এটা গণতন্ত্র নয়।’ স্বাস্থ্য প্রকল্প নিয়েও বিজেপির দাবি খারিজ করে অভিষেক বলেন, ‘আয়ুষ্মান ভারত সবাই পায় না, কিন্তু স্বাস্থ্যসাথী সবাই পায়। এটা বিজেপিকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার ভোট। বিজেপিকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রী করতে আলিপুরদুয়ারকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।’ সভা থেকে স্পষ্ট বার্তা দেন, তৃণমূল কংগ্রেসই একমাত্র শক্তি যারা বিজেপিকে বাংলায় পরাস্ত করতে পারে।
জনগণের সঙ্গে দরবার
ঘোষণা করা হয়েছিল আগেই। সেই মতো সভা শুরুর অনেক আগে থেকেই সভাস্থল থেকে বিতরণ করা হচ্ছিল একটা বিশেষ ফর্ম। তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে কী প্রশ্ন রয়েছে তাঁদের? সেই সব প্রশ্ন নাম-ঠিকানা সহ লিখে জমা দিলেন উপস্থিত দর্শকদের অনেকেই। সভা শেষে সেই সমস্ত প্রশ্নের কিছু উত্তর দিলেন অভিষেক।দিলেন পরামর্শ, করলেন সমস্যার সমাধান। বারুইপুরের পরে আলিপুরদুয়ারের র্যাম্প থেকে এটাই ছিল অভিষেকের আজকের চমক। চা-বাগান এলাকার মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা।
এদিন মঞ্চ থেকে বাছা কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন অভিষেক। এসআইআর, জমির পাট্টা থেকে শুরু করে চা-শ্রমিকদের মজুরি, বাড়ির সমস্যা। সবকিছুই মনযোগ দিয়ে শোনেন অভিষেক। কিছু ক্ষেত্রে হয়ে ওঠেন ‘মুশকিল আসান’।
রীতা তেরওয়ার প্রশ্ন -স্বামী দুবাইয়ে কাজ করে। হিয়ারিংয়ে ডেকে পাঠাচ্ছে। বলছে না এলে নাম বাদ দেবে।
অভিষেকের উত্তর -এভাবে নাম কাটা যাবে না। আপনার কাছে পাসপোর্ট আছে। ভিসা আছে। কনসুলেটে গিয়ে ফর্ম ফিলাপ করে মেইল করুন। কেউ জোর জবরদস্তি নাম কাটতে পারে না। সব গ্রাম পঞ্চায়েতে আমাদের ক্যাম্প আছে সেখানেও জানান।
সুরেশ সুরি – ১৯৯৫ সাল থেলে মধু চা বাগানে কাজ করি। এখনও মালিক ঘর বাড়ি দেয়নি। পাট্টা দেয়নি।
উত্তর -জমির পাট্টা সংবেদনশীল ইস্যু। সরকার যথা সম্ভব দিতে চায়। বাম আমলে কি ছিল দেখুন। আপনি যদি এতদিন অপেক্ষা করে থাকেন। আর কিছুদিন করুন। জেনুইন ইস্যু হলে ম্যানেজমেন্টকে বলুন। কারও সমস্যা হলে আমাদের শ্রমিক সংগঠন পাশে দাঁড়িয়ে যাবে। এটা আমাদের দায়িত্ব।
জয়প্রকাশখাখা – চা বাগানে স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাব। চিকিৎসক নেই। অনেক দূর হাসপাতালে যেতে হয়। নেইঅ্যাম্বুলেন্স।
উত্তর -আমি এটা জানি। আমার কাছে ফিডব্যাক আছে। আমি বলেছিলাম প্রাইমারি হেলথ সেন্টার বানাব। ৫৪ করব বলেছিলাম। ১৪ হয়েছে। ডাক্তারের সংখ্যা কম আছে। আমরা চেষ্টা করছি। আমার সাথে এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কথা হয়েছে। আমি ফিরে এই ইস্যু নিয়ে আবার করব। আমি যা কথা দিয়েছি তা সময় লাগলেও করব। আমি মিথ্যা বলব না। চা বাগান কেন্দ্রের বিশেষ করে যেগুলো বন্ধ। তাতে কেন্দ্রের ও ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব। আমি সমাধান করব।
রাজেশ ওরাও -দৈনিক মজুরি বাড়ানো হোক। (মঞ্চে ডেকে নিলেন অভিষেক) চা বাগানের ১৪ দফা দাবি আমরা খালি শুনছি। এখন খালি ২৫০ টাকা পাই। জঙ্গলের কাঠ পাইনা। কাঁচা বাড়িপাওয়া যাচ্ছে না। টিটেনাসইঞ্জেকেশন অবধি পাওয়া যাচ্ছে না। পাহাড়ি চা বাগানেঅ্যাম্বুলেন্স নেই। আমাদের ধার করে বা নিজের কষ্ট করে টাকায় আসতে হয়। স্কুল শিক্ষার জন্য বাস দেবেন বলেছিলেন। কিন্তু চা পাতা তোলার ট্রাক্টরে আমাদের বাচ্চাদের পশুর মতো নিয়ে যাওয়া হয়।

উত্তর – আপনার সব প্রশ্ন একদম ঠিক। মজুরির দাবি, মেডিক্যাল, স্কুলে যাওয়া নিয়ে সমস্যা একেবারে জেনুইন। আপনি ভাবুন, ২০১১ সালে যখন প্রথম সরকার আমাদের হয়, তখন ৬৭ টাকা মজুরি ছিল। অনেক লড়াই করে ২-৩ টাকা বাড়ত। এখন সেটা বেড়ে ২৫০ হল। আমি মিথ্যা বলব না আগেই বলেছিলাম। তাই বলছি ২৫০ টাকায় ঘর সংসার চলবে না। বেসিক জিনিস এই টাকায় কেনা যায় না। আমি কথা দিচ্ছি চতুর্থ বার সরকার আসলেই, চা বাগান আমাদের প্রথম প্রায়োরিটি হবে।
একমাসের মধ্যে হয় আমি আসব। নয়তো ত্রিপাক্ষিক বৈঠক হবে। মজুরি ২৫০ থেকে ৩০০ করব। এটা আমার কথা। কিন্তু যাঁরা আমাদের ঘর, কাজের টাকা আটকে রেখেছে তাঁদের উপযুক্ত জবাব দেব। আমি প্রকাশ চিক বরাইক ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দিচ্ছি। সেই সময় যে মন্ত্রী (শ্রম) থাকবেন সে আসবে। বাস রুট এখনও চালু হয়নি। পরশু থেকে সেই বাস চালু হবে। প্রয়োজন হলে রুট বাড়বে। ক্রেশ ও অ্যাম্বুলেন্স থাকবে।

সঙ্গীতাওরাও -আমার দেওরের স্ত্রীকে বাচ্চা নিয়ে কাজে যেতে হয়। ক্রেশ করা হবে বলেছিল। সাপ আছে এখানে। কী ব্যবস্থা নেবে সরকার। (কোহিনুর চা বাগান)
উত্তর -এই সব ক্রেশ আগামী কয়েক মাসে পুরো অপারেশনাল হবে। এখন ৩৪ ক্রেশ রয়েছে। চা বাগানে এই সমস্যা আছে আমি জানি। মালবাজারে আমি এই কাজের ব্যাপারে ঘোষণা করেছিলাম। আমি শ্রমমন্ত্রীকে আবার পাঠাব। দলের লোক মন্ত্রীর সাথে বসে এই কাজ দ্রুত করবে।
পর্বত মাহাতো -হান্টাপাড়া চা বাগানে ছয় মাস মজুরি বন্ধ।
উত্তর -পেমেন্ট কেন পাওয়া যাচ্ছে না? কাজ করলে পয়সা দিতে হবে। তোমরা প্রশাসনের কাছে যাও। হকের টাকা দিতে হবে। ম্যানেজমেন্টের সাথে আলাদা করেকথাবলো। আমাদের কাজ শ্রমিকদের পক্ষে হতে হবে। দরকার হলে আমি আসব।
মিলা নাগাসিয়া-রুপশ্রী প্রকল্পের আওতায় বিয়ের জন্য টাকা পাইনি। যদি একটু দেখেন।
অভিষেক ব্যানার্জি – বিয়ের পয়সা পাওয়া যায়নি? কেন?
উত্তর – জেলাশাসকের অফিসে দিয়েছিলাম।
অভিষেক ব্যানার্জি – আমাকে আবেদনের ছবি পাঠাও। আমি আজকেই ব্যবস্থা করব।