সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
বুধবার বিধানসভার অধিবেশনে সুর চড়াতে যান বিজেপি বিধায়করা। কিন্তু ধর্ম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে শঙ্কর ঘোষ, শুভেন্দু অধিকারীদের ধুয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন বিজেপি বিধায়কদের কাছে। মুখ্যমন্ত্রীর রণংদেহী মেজাজের কাছে কার্যত খড়কুটোর মতো উড়ে যায় বিজেপি বিধায়করা।
শুভেন্দুর চ্যাংদোলা হুঁশিয়ারিতে উত্তাল বিধানসভা। ধর্মের ভিত্তিতে এমন হুঁশিয়ারি দিতে পারেন না শুভেন্দু, সাফ কথা তৃণমূলের। পাল্টা কাগজ উড়িয়ে প্রতিবাদ বিজেপি বিধায়কদের। মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই বিজেপি ও তৃণমূলের বিধায়কদের মধ্যে তুমুল বচসা, তর্কাতর্কি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণের মধ্যেই চিৎকার পদ্ম বিধায়কদের।
এদিন মমতা যখন বিধানসভায় ঢোকেন তার কয়েক মিনিট আগেই গোলাম রব্বানিরা শুভেন্দুর মন্তব্যের প্রতিবাদে সরব হন। সংখ্যালঘু বিধায়কদের চ্যাংদোলা করে বাইরে ফেলে দেওয়া নিয়ে শুভেন্দু যে মন্তব্য করেছিলেন তার বিরোধিতায় তাঁরা নিন্দা প্রস্তাব আনেন। আর তাতেই যেন একেবারে আগুনে ঘি পড়ে। বিজেপির বিধায়করা উঠে দাড়িয়ে প্রতিবাদে সরব হন। স্লোগানও দিতে থাকেন। তীব্র চিৎকার চেঁচামমেচি শুরু হয়ে যায় বিধানসভার অন্দরে। তারমধ্যেই নিজের বক্তব্য রাখতে থাকেন মমতা। কিন্তু অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে একসময় তাঁকে বক্তৃতা থামিয়ে দিতে হয়।
স্পিকারের তরফে লাগাতার বিধানসভাকে শান্ত করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ব্যর্থ হন। মমতা নিজেও একাধিক সকলকে চুপ করতে বললেও ততক্ষণে কার্যত উত্তাল হয়ে উঠে বিধানসভার অন্দর। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের মাঝখানেই ফের চিৎকার শুরু করে দেন বিজেপি বিধায়করা। এরইমধ্যে ফের বলতে শুরু করেন মমতা। পাল্টা আক্রমণ শানান তিনিও। সেই পরিস্থিতিতেই নিজের বক্তৃতা চালিয়ে যান মমতা। তিনি বলেন, “যেভাবে একটা ধর্মকে আক্রমণ করা হচ্ছে, যেভাবে মুসলিম ধর্মের নাম করে বিরোধী দলনেতা আক্রমণ করছেন, তা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিরোধী দলনেতা সাসপেন্ডেড। কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি যে মন্তব্য করছেন, তাও বিরোধী দলনেতার মন্তব্য হিসেবেই ধরতে হবে। কারণ আমি যখন বাইরে কোনও মন্তব্য করি, সেটা কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেই কটাক্ষ করা হয়। তাহলে বিরোধী দলনেতার মন্তব্যকে কেন ধরা হবে না?” শুভেন্দুর নাম না নিয়ে বলেন, “ইটস বেটার টু ইগনোর হিম। কংগ্রেসে ভবিষ্যৎ নেই বলে তৃণমূলে আসে। তৃণমূলকে ঘেঁটে দিয়ে বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ করছিল। এবার আবার অন্য দলে যাওয়ার রিকোয়েস্ট এল বলে।”
জবাব দিতে উঠে তৃণমূল বিধায়কদের হুঁশিয়ারি দেওয়ার জন্য নাম না করেই বিরোধী দলনেতাকে আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দুর দল বদল নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘যিনি এইসব কথা বলেছেন, তাকে পস্তাতে হবে। তিনি তিনবার দল বদল করেছেন। তিনি লুকিয়ে কালো কাপড় মাথায় দিয়ে বিজেপির সাথে দেখা করেছেন। আর কিছুদিন বাদে দেখবেন আসবে অন্য দলে যাওয়ার প্রস্তাব আসবে। কটাক্ষের সুরে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আসলে তোমার জামা বদল হয়েছে। ভেতর একই আছে। এই জামা আবার যেন লাল জামায় পরিণত না হয়।’
গত বেশ কিছু কয়েক মাস ধরেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি পদে রদবদলের জল্পনা চলছে। এ দিন তা নিয়েও গেরুয়া শিবিরকে খোঁচা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এখন শুনছি দলের সভাপতি পদ পাওয়ার জন্য লড়াই করছেন। ভগবান, সভাপতি পদ পেতে লড়াই করতে হয়?’
বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণের ধার বাড়িয়ে সাফ বলেন, “আপনারা ধর্মীয় কার্ড খেলেন। সবথেকে বড় ধর্ম মানবিকতা। ধর্মের নামে জালিয়াতি করবেন না। আমি একজন হিন্দু। এটা আপনাদের কাছ থেকে সার্টিফিকেট নিতে হবে?”
এখানেই না থেমে আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে বলেন, “বাংলাকে অবমাননা করবেন না। বাংলা কে ভাগ করার চেষ্টা করবেন না। আপনারা কেন মুসলমান দের টিকিট দেন না? আমি তো ৭৯ পার্সেন্ট হিন্দুদের টিকিট দিই। মহিলাদের টিকিট দিই। আসলে কাক এখন ময়ূর হওয়ার চেষ্টা করছে।” এরপরই সংঘ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে বলেন, “রোজার মাসকে বেছে নিয়েছে মুসলমানদের আঘাত করার জন্য। সংখ্যালঘুরা নিশ্চিন্তে থাকুন। সর্ব ধর্ম সমন্বয় জিন্দাবাদ।”
এদিন বক্তব্যের প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক ছিলেন মমতা। মঙ্গলবার বিধানসভার সামনে শুভেন্দু অধিকারীর ‘মুসলিম বিধায়কদের ছুড়ে ফেলে দেব’ মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ধর্মের নামে জালিয়াতি করবেন না। বিজেপি নয়, হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করবে তৃণমূলই বিরোধী দল মানেই বিধানসভার মধ্যে রোজ ভাঙচুর হতে দেব না আমাদের দেশ ধর্মনিরপেক্ষ। এখানে সবাই নিজের ধর্মাচরণ করেন। আপনারা সরস্বতী পুজো নিয়ে মিথ্যাচার করছেন। আপনারা ধর্মীয় কার্ড খেলেন। সব থেকে বড় ধর্ম মানবিকতা। আপনাদের হিন্দু ধর্ম রামকৃষ্ণ – বিবেকানন্দের ধর্ম নয়। এটা রাজ্যকে ভয়ানক দিকে নিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ইরাকে যান, সেটা কোন ধর্মের দেশ? আপনারা জানেন না বাংলাদেশের কত হিন্দুকে আমরা আশ্রয় দিয়েছি?
পাল্টা বলতে উঠে তৃণমূলকে একহাত নেন বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ। তাঁর প্রশ্ন, “ফিরহাদ হাকিম, সিদ্দিকুল্লা, হুমায়ূন কবির প্রতিদিন হিন্দুদের আক্রমণ করে চলেছেন। তাদের বেলা কী হবে?” মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “ফিরহাদ হাকিম, মদন মিত্র যা বলেছেন, সেজন্য তাঁদের সাবধান করা হয়েছে দলীয় স্তরে। কিন্তু আপনারা উল্টো করছেন।”

আজ বিধানসভায় অতীতের ভাঙচুরের প্রসঙ্গ টেনে এনে শঙ্কর ঘোষ মুখ্যমন্ত্রীর জবাব চান। তখনই ক্ষুব্ধ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শঙ্কর ঘোষের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি বিধানসভার চেয়ার ভাঙিনি। প্রমাণ করতে পারলে, আমি মুখ্যমন্ত্রী পদ ছেড়ে দেব।’ এই কথা শোনার পরই তুমুল হট্টগোল শুরু করেন বিজেপি বিধায়করা। আর বিধানসভা থেকে ওয়াক আউট করেন। বিধানসভার বাইরে তখন কালো জামা পড়ে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং সাসপেন্ড হওয়া বিজেপি বিধায়করা। সেটা নিজে চোখে আগেই দেখেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাই মুখ্যমন্ত্রীর টিপ্পনি, ‘যাঁরা কালো জামা পড়েছেন ভাল, আমি কালো রং পছন্দ করি! কিন্তু কালো জামা কাপড় পরে লাভ নেই, আপনারা অন্ধকারে থাকুন।’ মুখ্যমন্ত্রীর এমন টিপ্পনি হজম করতে পারেননি বিজেপি বিধায়করা। তাই তাঁরা ওয়াক আউট করেন। তবে তার আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গেলে শঙ্কর ঘোষ-সহ অন্যান্য বিজেপি বিধায়করা তুমুল হট্টগোল শুরু করেন বলে অভিযোগ। বাংলায় হিন্দুরা আক্রান্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করিয়ে দেন, ‘আমাদের দলেরও ৪২ জন সাংসদ লোকসভা, রাজ্যসভায় আছেন। তাঁরাও বিএ কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকেন। আমি তাঁদের বারবার বলি তোমরা সব আলোচনায় অংশ নেবে। হাউস চালাতে সাহায্য করো। যখন আমরা কোনও চেয়ারে বসি, তখন আমরা সেটার প্রতি যত্নশীল থাকি।’
এইসব কথা যখন মুখ্যমন্ত্রী ভরা বিধানসভায় বলছেন তখনও হট্টগোল চালিয়ে যান বিজেপি বিধায়করা বলে অভিযোগ। এই আবহে নিজের বক্তব্য থামিয়ে ক্ষুব্ধ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আপনারা আগে বলে নিন। কিন্তু আমি বলার সময় আশা করব আপনারা বেরিয়ে যাবেন না।’ তখনই বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার ভাঙার প্রসঙ্গ টেনে শঙ্কর ঘোষ বললেন, ‘আমি আশা করব আপনি স্বীকার করবেন এই বিধানসভার সদস্য না হয়েও আপনি বিধানসভা ভাঙার কাজে যুক্ত ছিলেন।’ তখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে জানিয়ে দেন, ‘প্রমাণ দিতে পারলে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেব।’
Source : www.kolkatasaradin.com