শোভন গায়েন। কলকাতা সারাদিন।
দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষে উত্তপ্ত মালদহের মোথাবাড়ি। এখনও থমথমে পরিস্থিতি। রবিবার মোথাবাড়ির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে রওনা দেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। কিন্তু মাঝপথেই সুকান্তকে আটকাল পুলিশ। মোথাবাড়ির বেশ কয়েক কিলোমিটার আগেই আটকানো হয় সুকান্ত-সহ বিজেপি কর্মীদের।
পুলিশের বাধা পেয়ে রাস্তাতেই বসে পড়েন সুকান্তরা। রাস্তা থেকেই থেকেই মাইক হাতে তৃণমূল-পুলিশ প্রশাসনের তুলোধনা করেন সুকান্ত। হুঙ্কারের সুরে বলেন, “জেলে যেতে হলে জেলে যাবেন। আমার যুব মোর্চার ভাইদের কাছে অনুরোধ করে যাচ্ছি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এলে তাঁকে জয় শ্রী রাম স্লোগান স্বাগত জানাবেন। উনি পশ্চিমবঙ্গের যেখানে যাবেন সেখানে আমরা জয় শ্রীরাম বলব।” সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন, “পুলিশকে বলছি আপনারা হিন্দুদের সুরক্ষিত করুন।” ছেড়ে কথা বললেন না রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারকেও। তীব্র আক্রমণ শানিয়ে বললেন, “রাজীব কুমার আমার ভাষণ টিভিতে দেখছে। ওনাকে বলে দিতে চাই বেশিদিন মুখ্যমন্ত্রী আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। আপনাকেও জেলে যেতে হবে আপনার সময় এসে গিয়েছে।”
সুকান্তদের আটকাতে পরপর ব্যারিকেড তৈরি করে পুলিশ। প্রথম ব্যারিকেড ভেঙে ফেলে বিজেপি কর্মীরা। এরপর সাদুল্লাপুরের কাছে ১০-১২ ফুট উচ্চতার বাঁশের দ্বিতীয় ব্যারিকেডে সুকান্তদের আটকায় পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন বিজেপি কর্মীরা। মোথাবাড়িতে হামলার সময় পুলিশ কর্মীরা কোথায় ছিল? প্রশ্ন তুলে বিক্ষোভ বিজেপি কর্মীদের। “পুলিশমন্ত্রী হায় হায়” স্লোগানও দেন বিজেপি কর্মীরা।
প্রাথমিক ব্যারিকেড ভাঙার পর পুলিশ আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা নিয়েছে। বাঁশ দিয়ে তৈরি একটি বড় ব্যারিকেড তৈরি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে তারা। এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, “আমরা শান্তি বজায় রাখতে কাজ করছি। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকে এখন এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।” তবে, বিজেপি নেতারা এই পদক্ষেপকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে দেখছেন। ক্ষুব্ধ কর্মীদের শান্ত করতে ওই ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়েই ধৈর্য ধরার কথা বলতে গিয়েও সুকান্ত বললেন, “আজ আমাদের আটকে দিয়েছে। কিন্তু, তাতে হয়তো আজ সাময়িকভাবে আমাদের লড়াই শেষ হচ্ছে। আমরা ২ মিনিট পেলে এই ব্যারিকেড ভাঙতে পারতাম। কিন্তু এখন ম্যাচের আগে প্রাকটিস ম্যাচ হচ্ছে। যদি ভাঙতে হয়, তাহলে নবান্নের সামনের ব্যারিকেড ভাঙব। ওতে মজা আলাদা।”
সুকান্ত মজুমদার সাংবাদিকদের বলেন, “মোথাবাড়িতে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে চাই। কিন্তু পুলিশ আমাদের আটকে রেখে সত্য লুকানোর চেষ্টা করছে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে এবং এখন বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করতে মরিয়া।
রবিবার মোথাবাড়ি পৌঁছনোর ১০ কিলোমিটার আগে গাড়ি থেকে নামে সুকান্ত। মোথাবাড়ি থেকে ১০ কিলোমিটার আগেও পুলিশি ধরপাকড় ও নির্দোষদের গ্রেফতারি চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অভিযোগ পেয়ে এদিন গাড়ি থামিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন সুকান্ত মজুমদার। হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামে পুলিশ অত্যাচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ সুকান্তর। তিনি বলেন, “পুরুষদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে, রাতে মহিলাদের অত্যাচার করছে পুলিশ।” এদিন মোথাবাড়িতে গিয়েও টানেন রাম নবমীর প্রসঙ্গও। টানেন যোগীর প্রসঙ্গও। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে কীভাবে রাম নবমী হয় তা মনে করিয়ে কর্মীদের ‘আর একটু অপেক্ষা’ করার কথা বললেন বঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি। বলেন, “উত্তর প্রদেশে যোগী বাবার সরকার আছে। যখন ওখানে রাম নবমীর মিছিল হয় তখন মুসলিমরা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ফুল ছেটায়, সরবত খাওয়ায়। অপেক্ষা করুন ছাব্বিশ অবধি। সেই রাম দৃশ্য আপনারাও দেখতে পাবেন। আপনারা রাম নবমীর মিছিল করবেন, আর মুসলিম ভাইয়েরা পাশে দাঁড়িয়ে সরবত খাওয়াবেন।”
বিজেপির মহিলা মোর্চার নেত্রীরা এসে স্থানীয়দের থেকে অভিযোগ নেবেন ও তা জাতীয় মহিলা কমিশনে পাঠানো হবে বলে জানান সুকান্ত। স্থানীয়দের কোনও অসুবিধা হলে বিজেপি কর্মীদের ফোন করে জানাতে বলেন সুকান্ত। পুলিশের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সুকান্ত বলেন, জেলার পুলিশ আধিকারিকদের দিল্লিতে ডেকে নিয়ে উপযুক্ত শাস্তি দিক জাতীয় মহিলা কমিশন।
রবিবারও থমথমে মোথাবাড়ি। সেখানেই যাওয়ার পথে বিজেপি রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারকে এলাকায় ঢুকতে দিল না পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মোথাবাড়ির সংঘর্ষের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত প্রায় ৬১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১৯টি মামলা রুজু করা হয়েছে। গোটা এলাকা জুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্ট ইতিমধ্যে মালদার জেলা প্রশাসন ও পুলিশের কাছে এই ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছে। আগামী ৩ এপ্রিলের মধ্যে এই রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিজেপি জানিয়েছে, তারা এই ঘটনার জন্য জাতীয় তদন্ত সংস্থার (এনআইএ) তদন্ত চাইবে।