সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
স্বাভাবিকভাবে জলে পড়ে মৃত্যু হয়নি আমার মেয়ের। ওকে নিশ্চয়ই কেউ ডেকেছিল। তারপর যেতেই ওঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। ও কখনওই অন্ধকারে একা যেত না, ভয় পেত। এমন বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে যাদবপুর ছাত্রী মৃত্যুর ঘটনায় খুুনের অভিযোগ তুললেন নিহতের বাবা অর্ণব মণ্ডল। যাদবপুরের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী অনামিকা মণ্ডল বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্কি লটে আয়োজিত ড্রামা ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানেই যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানের মাঝেই হঠাৎ করে ৪ নং গেট লাগোয়া ঝিলের পাশে থাকা শৌচালয়ে যান তিনি। তারপর আর ফেরেননি।
শুক্রবার অনামিকার ময়নাতদন্তের যে রিপোর্ট প্রকাশ্যে এসেছে তাতে বলা হয়েছে, জলে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে ওই পড়ুয়ার। তারপরেও খুনের অভিযোগ করে বাবা অর্ণব মণ্ডল বলেন, ওকে নিশ্চয়ই কেউ কোনও প্রস্তাব দিয়েছিল। যাতে ও রাজি হয়নি বলেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। ও ইচ্ছাকৃত জলে পড়ে যায়নি। যেখান থেকে ওর দেহ পাওয়া গিয়েছে, সেখানে ওকে কেউ ডেকেছিল বলেই মনে হচ্ছে। যদি আমি ধরেওনি ও শৌচালয়ে যাওয়ার জন্যই ঝিল পাড়ে গিয়েছিল, তাও আমার বিশ্বাস হচ্ছে না ও ওই অন্ধকারে যাবে। ও একা ওখানে যেতেই পারে না।
অন্যদিকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর রহস্যমৃত্যুর ঘটনায় তৎপর জাতীয় মহিলা কমিশন। স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করা হয়েছে। চেয়ারপার্সন বিজয়া রোহতকর সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে এই মর্মে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। জাতীয় মহিলা কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, আগামী ৩ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
ছাত্রীমৃত্যুর ফরেন্সিক পরীক্ষা ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মৃতার পরিবারের কাছে নিয়মিত আপডেট পৌঁছে দিতে হবে।
কোন পথে তদন্ত
কীভাবে মৃত্যু, সেটাই এখনও পুরোপুরি রহস্য।পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ঠিক কী জানিয়েছিলেন মৃত অনামিকা মণ্ডলের বন্ধুরা? তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী তাঁরা জানান, বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল। রাতের দিকে ঝিলপাড়ে বসেছিলেন ৫ বন্ধু। তাঁদের সঙ্গেই ছিলেন অনামিকা। সকলে মিলে মদ্যপান করেন। এরপরই জলে নামার ইচ্ছে প্রকাশ করেন সকলেই। পুলিশি জেরায় বন্ধুদের দাবি, অনামিকা নাকি বলেন, গরম লাগছে, আমি জলে নামব। বন্ধুরা জানত তিনি সাঁতার জানেন না। তাই স্বাভাবিকভাবেই বারণ করেন। কিন্তু ঝিলে জল বিশেষ না থাকায় এতবড় বিপদের আশঙ্কা করেনি কেউ। আচমকাই নাকি ঝিলে নামেন অনামিকা। মদ্যপ অবস্থায় বন্ধুরা বোঝেন তিনি তলিয়ে যাচ্ছেন। জিজ্ঞাসাবাদে মৃতার বন্ধুরা দাবি করেন, তাঁরা অনামিকাকে বাঁচাতে জলে নামেন। তুলে আনেন বন্ধুকে। কিন্তু ততক্ষণে অচৈতন্য হয়ে পড়েছেন অনামিকা। চিৎকার করে তাঁরা লোক ডাকে। খবর দেওয়া হয় নিরাপত্তারক্ষীদের। সঙ্গে সঙ্গে অনামিকাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করে। দেহে মেলেনি কোনও আঘাতের চিহ্নি। কিন্তু যে ঝিলে পড়েছিলেন তরুণী, সেটির গভীরতা ৪ থেকে ৫ ফুট। ফলে সেখানে পড়ে মৃত্যু নিয়েও প্রশ্ন থাকছেই। যদিও চিকিৎসকদের থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, গভীরতার উপর মৃত্যু নির্ভর করে না অনেকক্ষেত্রেই। একটা নির্দিষ্ট সময় নাক-মুখ জলের নিচে থাকলে মৃত্যু ঘটতেই পারে। মদ্যপ ছিলেন কি না তা ভিসেরা রিপোর্ট এলেই স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ আধিকারিকরা।
কিন্তু শেষ ১৯ মিনিট ঘিরেই দানা বেঁধেছে রহস্য। বৃহস্পতিবার রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নং গেট লাগোয়া ঝিলে ভেসে ওঠা মৃতদেহ ঘিরে শুধুই ধোঁয়াশা। প্রাথমিক নজরে এবং ময়নাতদন্তে জলে ডুবে মৃত্যুর কথা উঠে এলেও, ঘটনার নেপথ্যে কোনও ঘটনা নেই তো? সেটাই এখন ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের। উত্তর ২৪ পরগনার নিমতার বাসিন্দা অনামিকা মণ্ডল। অনুষ্ঠান ছেড়ে যাওয়া, তারপর আর না ফেরা, ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের। ঠিক কী হয়েছিল সেই ১৯ মিনিটে। এই সময়কালে কারা শেষবার জীবিত অবস্থায় দেখেছিল তাঁকে? কারাই বা প্রথম তাঁর দেহ ভাসতে দেখেছিল? আর কারাই বা তাঁর দেহ উদ্ধার করেছিল? তদন্তকারীদের ভাবাচ্ছে সব প্রশ্নগুলিই। পুলিশ সূত্রে খবর, আগামিকাল ঘটনাস্থলে যাবে ফরেন্সিকের একটি টিম। এছাড়াও, যারা প্রথম অনামিকাকে দেখেছিল, এমন সাত জনকে তলব করেছে পুলিশ। সূত্রের খবর, ১০টা ১ মিনিটে নিহত ছাত্রীকে হেঁটে যেতে দেখেছিল বেশ কয়েকজন। তার কিছু সময় পরেই কয়েকজন ঝিলের দিকে ছুটে যায়। ১০টা ১০ মিনিট নাগাদ খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। ১০টা ২০মিনিট নাগাদ উদ্ধার হয় ছাত্রীর দেহ। আর এই ১৯ মিনিটেই অনেক ধোঁয়াশা রয়েছে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।