শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে ক্যাভিয়েট দাখিলের পরে শীর্ষ আদালতে দ্রুত তৎপরতা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি-র। সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ ইডি। সেখানে দ্রুত শুনানির আবেদন করে দুটি মামলা দায়ের করল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।
সোমবার দ্রুত শুনানির আবেদন জানিয়ে একদিকে যেমন ইডি একটি মামলা দায়ের করে, অন্যদিকে ইডি-র তিন আধিকারিক একটি মামলা দায়ের করেন। তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের পরবর্তী শুনানির দিন পছন্দ হয়নি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার। একদিকে নির্বাচনের আগে কোনওভাবেই যেন তদন্তে বাধা না আসে, তার আবেদন। অন্যদিকে ইডি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে যেন পদক্ষেপ আগে থেকে কলকাতা পুলিশ না নিতে পারে, তার জন্য আদালতের নির্দেশ প্রয়োজন ছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার। ফলে শনিবারই সুপ্রিম কোর্টে ই-মেল মারফৎ মামলার আবেদন জানানো হয়।
সোমবার সকালে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া মামলার তালিকায় ইডি-র দুটি মামলা দেখা যায়। একটি মামলা কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থা ইডি-র তরফে দায়ের হয়। যেখানে তদন্তে বাধা দানের অভিযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাজ্য সরকার যাতে তদন্তে আর বাধা দিতে না পারে, তা নিয়ে আবেদন করা হয়। সেই সঙ্গে আইপ্যাকে ইডি বৃহস্পতিবার যে তল্লাশি অভিযান চালিয়েছিল, তাতে বাধা দানে সিবিআই তদন্তের আবেদন জানানো হয়। তাতে পার্টি করা হয়েছে বা সহজ করে বলতে গেলে অভিযুক্ত করা হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায় এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারকে। সংশ্লিষ্ট আবেদনে তল্লাশিতে বাধা, বলপ্রয়োগ-সহ একাধিক অভিযোগ এনেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।
অন্য একটি মামলা দায়ের করেন ইডি-র তিন আধিকারিক। ঘটনার দিন তল্লাশিতে যে আধিকারিকরা যুক্ত ছিলেন তাঁরা এই মামলা দায়ের করেছেন, তদন্তে বাধার অভিযোগ তুলে। ইডি আধিকারিকরা যে বাধা পেয়েছেন, তার উল্লেখ রয়েছে এই মামলায়। সেই সঙ্গে কোনও শুনানির আগে মুখ্যমন্ত্রীর দায়ের করা অভিযোগের প্রেক্ষিতে যাতে কলকাতা পুলিশ ইডি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিতে না পারে, তারও সওয়াল চালাবে ইডি। ইডি জানিয়েছে, তারা যে আই-প্যাকের প্রতিষ্ঠাতা প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছিলেন তার জন্য যথেষ্ট কারণ ছিল। তদন্তে জানা গেছিল, ২০ কোটি টাকার বেশি ‘অপরাধলব্ধ অর্থ’ তারা পেয়েছে। কিন্তু সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যসচিব, ডিজিপি, কলকাতার পুলিশ কমিশনার ও অন্যান্য পুলিশ আধিকারিকরা একসঙ্গে সেখানে ঢুকে পড়েন বলে অভিযোগ। ইডির দাবি, ওই আধিকারিকরা তদন্তকারী অফিসারদের ভয় দেখান, হুমকি দেন এবং তল্লাশির সময় বাজেয়াপ্ত করা গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ইলেকট্রনিক প্রমাণ কেড়ে নেন। এমনকি তল্লাশি আর চালাতেও দেওয়া হয়নি। ইডির ভাষায়, এটি ছিল প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট অনুযায়ী সংগৃহীত প্রমাণে সরাসরি হস্তক্ষেপ।
অন্যদিকে, তৃণমূলের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউ়ডন স্ট্রিটের বাড়িতে ইডির হানা নিয়ে বিশদে জানতে এ বার তাঁর প্রতিবেশীদের সঙ্গেও কথা বলতে চায় পুলিশ। ৭, লাউডন স্ট্রিটে প্রতীকের বাড়ির আশপাশে যাঁরা থাকেন, তাঁদের বয়ান সংগ্রহ করা হতে পারে। ইডি-র গোয়েন্দারা সে দিন ঠিক কখন এসেছিল, পুলিশ পৌঁছোনোর আগে পর্যন্ত কী কী করেছে, পরেই বা কী ঘটে, কেউ কিছু দেখেছেন কি না, এলাকার বাসিন্দাদের কাছে তা জানতে চাওয়া হবে। থানায় ডেকে প্রতীকের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলতে পারে পুলিশ। প্রতীক জৈনের বাড়িতে গত ৮ জানুয়ারি ভোরে হানা দিয়েছিল ইডি। কয়েক ঘণ্টা পরে সেখানে পুলিশ যায়। অভিযোগ, পুলিশকে বাড়িতে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে। নীচে দেখানো হয়নি কোনও পরিচয়পত্র বা তল্লাশির পরোয়ানা। এমনকি, বাড়ির সামনে পুলিশকে ধাক্কাধাক্কির অভিযোগও তোলা হয়েছে। অভিযোগ, ঘটনাস্থলে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছেন কলকাতা পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) প্রিয়ব্রত রায়। পরে প্রতীকের বাড়িতে যান কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রতীকের বাড়িতে ইডির হানা নিয়ে ইতিমধ্যে মুখ্যমন্ত্রী শেক্সপিয়র সরণি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। এ ছাড়া, বাড়িতে ঢুকতে বাধা পাওয়ায় পুলিশের তরফেও স্বতঃপ্রণোদিত একটি অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছিল। তার তদন্তও চলছে। শেক্সপিয়র সরণি থানার পুলিশ আগেই প্রতীকের বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী, পরিচারিকার বয়ান সংগ্রহ করেছে। সংগ্রহ করা হয়েছে বাড়ির সমস্ত সিসি ক্যামেরার ফুটেজ।