সুষমা পাল মন্ডল। কলকাতা সারাদিন।

একই বাড়িতে থাকলেই পরিবার? স্বামী-স্ত্রীর আলাদা ঠিকানা হলে কী হবে, বাড়ছে বিভ্রান্তি

অন্নপূর্ণা ভান্ডারের ১২ পাতার ফর্ম ঘিরে রাজ্যজুড়ে যত দিন যাচ্ছে, ততই বাড়ছে বিভ্রান্তি। আধার, ব্যাঙ্ক, ভোটার কার্ড, আয়—সব তথ্য চাওয়ার পর এবার নতুন করে চর্চায় উঠে এসেছে একটি শব্দ—‘পরিবার’। আর এই এক শব্দ ঘিরেই এখন সাধারণ মানুষের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে একগুচ্ছ প্রশ্ন।

কারণ, সরকার যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তা শুনে অনেকেই বলছেন—“তা হলে আমাদের ক্ষেত্রে কী হবে?”

অন্নপূর্ণা ভান্ডারের আবেদনপত্র ইতিমধ্যেই বহু মানুষের হাতে পৌঁছে গিয়েছে। কেউ অনলাইনে ডাউনলোড করছেন, কেউ আবার স্থানীয় স্তরে ফর্ম সংগ্রহ করছেন। কিন্তু ফর্মের শেষ পাতায় গিয়ে কার্যত চমকে উঠছেন অনেক আবেদনকারী।

সেখানে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে, “পরিবার বলতে এমন একদল ব্যক্তিকে বোঝানো হচ্ছে, যারা সাধারণত একসঙ্গে বসবাস করেন এবং একই রান্নাঘর থেকে খাবার খান।”

আর এই সংজ্ঞাই এখন তৈরি করেছে বড় ধোঁয়াশা।

কারণ, বর্তমান সময়ে বহু পরিবারই আর সেই পুরনো কাঠামোয় আটকে নেই। কাজের সূত্রে স্বামী এক জেলায়, স্ত্রী অন্য জেলায় থাকেন—এমন ঘটনা এখন খুবই সাধারণ। কেউ কলকাতায় চাকরি করেন, পরিবার থাকে মুর্শিদাবাদে। কেউ ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, স্ত্রী-সন্তান থাকেন গ্রামে। তাহলে তাঁরা কোন ক্যাটাগরিতে পড়বেন?

এই প্রশ্নই এখন ঘুরছে চায়ের দোকান থেকে ব্লক অফিস পর্যন্ত।

শুধু তাই নয়, ভোটার কার্ড ও আধার কার্ডের ঠিকানা নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন জট। বহু বিবাহিত মহিলার ভোটার কার্ড এখনও বাবার বাড়ির ঠিকানায়। আধারেও সেই পুরনো ঠিকানাই রয়েছে। অথচ তাঁরা স্বামীর সঙ্গে অন্যত্র থাকছেন। সেক্ষেত্রে আবেদন করার সময় কোন ঠিকানা ব্যবহার হবে? পরিবার হিসেবে কাদের নাম ধরা হবে?

 

এমনই নানা প্রশ্ন এখন উঠে আসছে সাধারণ মানুষের মুখে।

ফর্মে আবেদনকারীর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের নাম, পেশা, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ভোটার তথ্য, স্বাস্থ্যবিমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা—সব কিছু বিস্তারিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। ফলে কে “পরিবারের সদস্য” হিসেবে গণ্য হবেন, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ইতিমধ্যেই বহু মানুষ ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে থমকে গিয়েছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকাগুলিতে এই বিভ্রান্তি আরও বেশি। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই একই বাড়িতে থেকেও আলাদা রান্না হয়। আবার অনেকে বাইরে কাজ করলেও রেশন কার্ডে এখনও পরিবারের সদস্য হিসেবেই নাম রয়েছে।

ফলে বাস্তবে কোন নিয়ম কার্যকর হবে, তা নিয়েই বাড়ছে কৌতূহল।

এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় বিএলও বা বুথ লেভেল অফিসারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, আবেদনকারীদের ফর্ম পূরণের আগে এলাকার বিএলও-র সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়গুলি পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

রাজনৈতিক মহলেও এই ফর্ম ঘিরে চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিরোধীদের একাংশের দাবি, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য এত বিশদভাবে চাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপির দাবি, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করতেই এই তথ্য সংগ্রহ জরুরি।

তবে সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন—ভুল তথ্য দিলে কি আবেদন বাতিল হবে? আর বাস্তব জীবনের জটিল পারিবারিক পরিস্থিতিকে সরকার কীভাবে বিচার করবে?

এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশ্যে না আসায় বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে। ফলে অন্নপূর্ণা ভান্ডারের সুবিধা পেতে গিয়ে অনেকেই এখন কাগজপত্রের চেয়ে বেশি লড়াই করছেন “পরিবার” শব্দটার সংজ্ঞা নিয়ে।

আগামী দিনে সরকার কি এই ধোঁয়াশা কাটাতে নতুন নির্দেশিকা আনবে? নাকি ফর্ম ঘিরে বিভ্রান্তিই আরও বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেবে—এখন সেদিকেই তাকিয়ে বাংলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *