সুহানা বিশ্বাস। কলকাতা সারাদিন।
“বিদেশনীতিতে আমরা কেন্দ্রের পাশে রয়েছি। এখনও আমরা কেন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি ও অ্যাকশনকে সমর্থন করছি। কিন্তু ওরা সদস্য নির্ধারণ করে দিতে পারে না। তারা নিজেদের সদস্য বাছাই করতে পারে, কিন্তু অন্য দলের সদস্য ঠিক করে দিতে পারে না।” অপারেশন সিঁদুর নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তথ্য প্রমাণ আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ভারতের সর্বদলীয় সাংসদ প্রতিনিধি দল থেকে তৃণমূল সাংসদ ইউসুফ পাঠানের নাম প্রত্যাহারের প্রেক্ষিতে এভাবেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর মমতার সুরে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
সোমবার উত্তরবঙ্গ সফরে যাওয়ার পথে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অপারেশন সিঁদুর নিয়ে কেন্দ্রের সর্বদল প্রতিনিধি দলে তৃণমূলের নাম প্রত্যাহার নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার জবাব দিলেন। তিনি বলেন, “এখন এমন সিস্টেম হয়ে গিয়েছে যে কেন্দ্র দলকেই জানায় না।সংসদীয় দল শুধুমাত্র সংসদ অধিবেশনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, নীতি নির্ধারণ করতে পারে না।”
কেন্দ্রের সর্বদলে প্রতিনিধি পাঠানোর প্রসঙ্গে এ দিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কোনও আবেদন আসেনি আমাদের কাছে। যদি আমাদের কাছে আবেদন আসত, তবে আমরা অবশ্যই বিবেচনা করতাম। আমরা দেশের পাশে রয়েছি। আগেও বলেছি, বিদেশনীতিতে আমরা কেন্দ্রের পাশে রয়েছি। এখনও আমরা কেন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি ও অ্যাকশনকে সমর্থন করছি। কিন্তু ওরা সদস্য নির্ধারণ করে দিতে পারে না। তারা নিজেদের সদস্য বাছাই করতে পারে, কিন্তু অন্য দলের সদস্য ঠিক করে দিতে পারে না। এটা দলের সিদ্ধান্ত। যদি আমায় অনুরোধ করে, তবে আমরা চিন্তাভাবনা করে নাম পাঠাব।”
ইউসুফ পাঠান ‘না’ বলে দেওয়ার পরই জল্পনা রটেছে যে তৃণমূল কেন্দ্রের এই উদ্যোগকে বয়কট করেছে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে কেন্দ্রের এই উদ্যোগকে বয়কট করছে না। তিনি বলেন, “তৃণমূলের কোন সাংসদ বিদেশে যাচ্ছেন না মানে আমরা বয়কট করছি, এটা বলা ঠিক নয়। এটা ভুল। সংসদীয় দল সংসদের বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, সিদ্ধান্ত নেয়। সেটাও দলের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়। লোকসভা-রাজ্যসভার চেয়ারম্যান আমি। অথচ আমাদের কখনও জানানো হয় না। আমাদের জানালে অবশ্যই জানাব।”
তৃণমূলের পার্লামেন্টারি কমিটির চেয়ারপার্সন মমতার সুরেই বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করে কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বদলীয় প্রতিনিধিদলের গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ সোমবার দিল্লি যাওয়ার পথে কলকাতা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্পষ্ট জানান যে, কোন দল থেকে কে প্রতিনিধি হবেন, সেই বাছাই বিজেপি সরকার বা কেন্দ্রের হাতে থাকার কথা নয়। দলের সিদ্ধান্তই এই ক্ষেত্রে চূড়ান্ত হওয়া উচিত।
সন্ত্রাস দমনে ও দেশরক্ষায় কেন্দ্রীয় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, তৃণমূল তার পাশে থাকবে বলে জানিয়েছেন অভিষেক। তিনি বলেন, “জঙ্গি দমনে সকলে মিলে লড়তে হবে। তবে বহুদলীয় প্রতিনিধিদলের গঠন নিয়ে তার আপত্তি রয়েছে। জঙ্গিবাদ মোকাবিলা এবং ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর মতো বিষয়গুলি বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে পাকিস্তানের মুখোশ খোলার লক্ষ্যে এই প্রতিনিধিদল বিভিন্ন দেশ সফর করবে।”
তবে অভিষেক প্রশ্ন তোলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার দেশের অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে কথা না বলে, তাদের প্রতিনিধি বেছে নিতে না বলে কীভাবে নিজেদের মতো নাম ঠিক করতে পারে?” তিনি নিজে পররাষ্ট্র মন্ত্রকের স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লি যাচ্ছেন এবং তাঁর এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি দল কর্তৃক মনোনীত – এই প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, ঠিক এভাবেই কে কোন দলের প্রতিনিধিত্ব করবে, তা দলেরই ঠিক করার কথা। কেন্দ্রীয় সরকার ঠিক করে দিতে পারে না।
তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, যেকোনো দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব তাঁরাই করেন, যাঁরা ভাল কথা বলতে পারেন বা গুছিয়ে অভিজ্ঞতায় ভর করে পরিস্থিতি বিবেচনা করতে পারেন। কোন দলে এমন কোন নেতা বা প্রতিনিধি রয়েছেন, তা কেন্দ্রের থেকে ভাল নির্দিষ্ট দলই বুঝবে। ফলে প্রতিনিধি নির্বাচনের দায়িত্ব দলের ওপর থাকাই কাম্য ছিল। অভিষেক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বৃহত্তর স্বার্থে সরকারকে এটা বুঝতে হত। তৃণমূল থেকে কে যাবেন এটা বিজেপি কী করে ঠিক করে দিতে পারে। সরকার কী করে ঠিক করে দিতে পারে? তাঁরা তো তৃণমূলের প্রতীকে জিতে সাংসদ হয়েছেন।”
অভিষেক স্পষ্ট করে দেন যে, তৃণমূল এই প্রতিনিধিদলকে বয়কট করেনি। বরং তৃণমূলই একমাত্র দল, যারা এই পরিস্থিতিতে জঙ্গি দমন কার্যকলাপের সঙ্গে কোনও ঘটনাতে রাজনীতির রং লাগায়নি। তবে প্রতিনিধি বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি সঠিক হওয়া উচিত ছিল বলে তার মত। কেন্দ্রের উচিত ছিল বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করা। দলই ঠিক করে দিত কে বিশ্বের দরবারে ভাল বলতে পারেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, তিনি কাউকে অসম্মান করছেন না কিন্তু এটাই হওয়া উচিত ছিল।