সুমনা মিশ্র। কলকাতা সারাদিন।
নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ইতিমধ্যেই আলোচিত নাম বিভাস অধিকারী ফের শিরোনামে। বীরভূমের এই প্রাক্তন তৃণমূল নেতা এবার গ্রেফতার হলেন নয়ডায়, তাও আবার এক অভূতপূর্ব অভিযোগে—ভুয়ো থানা খুলে প্রতারণা! নয়ডার সেক্টর ৭০-এর বিএস-১৩৬ নম্বর বাড়ি থেকে শনিবার রাতে তাঁকে, তাঁর ছেলে অর্ঘ্য অধিকারী এবং আরও পাঁচজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, অভিযুক্তরা “ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ অ্যান্ড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন” নামে একটি অফিস চালাচ্ছিলেন, যা দেখতে প্রায় থানার মতো। অফিসের বাইরে লাগানো ছিল পুলিশের মতো বোর্ড, ভেতরে ছিল ভুয়ো কাগজপত্র, জাল পরিচয়পত্র ও নানা রকম অফিসিয়াল সজ্জা। অভিযুক্তরা নিজেদের সরকারি আধিকারিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতেন এবং তোলাবাজি চালাতেন।
বিভাস অধিকারীর নাম প্রথম উঠে আসে প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায়, যখন যুব তৃণমূলের প্রাক্তন নেতা কুন্তল ঘোষ গ্রেফতার হন। কুন্তলের জবানবন্দি, এবং তদন্তে রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের অপসারিত সভাপতি মানিক ভট্টাচার্যের গ্রেফতারির পর বিভাসের দিকেও নজর যায় তদন্ত সংস্থার।
একসময় বেসরকারি বিএড ও ডিএলএড কলেজ সংগঠনের সভাপতি ছিলেন নলহাটির বাসিন্দা বিভাস। মানিক ভট্টাচার্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। ইডি ও সিবিআই তাঁর বীরভূমের বাড়ি, আশ্রম এবং উত্তর কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়েছিল।
রাজনীতিতে তিনি একসময় অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং নলহাটি-২ ব্লকের তৃণমূল সভাপতি পদেও ছিলেন। কিন্তু গরু পাচার মামলায় অনুব্রত গ্রেফতার হওয়ার পর দল ছেড়ে দেন এবং ‘অল ইন্ডিয়া আর্য মহাসভা’ নামে নতুন দল গঠন করেন।
নয়ডা পুলিশের অভিযানে বিভাস ও তাঁর সহযোগীদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে— তিনটি মোবাইল ফোন, তিনটি আলাদা ব্যাংকের চেকবই, ১৬টি রাবার স্ট্যাম্প, একটি স্ট্যাম্প প্যাড, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৯টি আইডি কার্ড, তিনটি ভিজিটিং কার্ড, শংসাপত্র, লেটারহেড, একাধিক এটিএম কার্ড, নগদ ৪২,৩০০ টাকা।
পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের সঙ্গে সম্পর্কিত জাল নথি এবং ইন্টারপোল ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনের নাম ব্যবহার করে তৈরি জাল কাগজপত্রও মিলেছে। এমনকি অভিযুক্তরা দাবি করতেন, তাঁদের ব্রিটেনে অফিস রয়েছে!
পুলিশ সূত্রে খবর, মাত্র কয়েকদিন আগে নয়ডায় ওই অফিস খোলা হয়। অফিসের বাইরে থানার মতো বোর্ড বসানো হয় প্রায় দশ দিন আগে। বিভাস নিজে সম্প্রতি নয়ডাতেই বসবাস শুরু করেছিলেন। তাঁর ছেলে অর্ঘ্য অধিকারী আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন। বাকিদের মধ্যে বাবুলচন্দ্র মণ্ডল, পিন্টু পাল, সমাপদ মাল, আশিস কুমার—সকলেই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, অভিযুক্তরা সরকারি কর্মকর্তা সেজে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতেন। তাঁরা কখনও সরকারি তদন্ত বা আন্তর্জাতিক অপরাধ সংস্থার সংযোগের গল্প সাজিয়ে ভয় দেখাতেন, কখনও আবার নিয়োগ সংক্রান্ত সাহায্যের প্রলোভন দিতেন।

নয়ডা পুলিশের ডিসিপি সেন্ট্রাল শক্তিমোহন অবস্তি জানিয়েছেন—”অভিযুক্তরা ইচ্ছাকৃতভাবে থানার মতো অবকাঠামো তৈরি করেছিল, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে বিশ্বাস করে।” গ্রেফতার হওয়া সাতজনের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধি এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। তাঁদের আদালতে তোলা হলে বিচারক বিচারবিভাগীয় হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তকারী সংস্থা এখন এই প্রতারণা চক্রের অর্থনৈতিক লেনদেন, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য সহযোগীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।