সুমন তরফদার। কলকাতা সারাদিন।
ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একটি বড় পরিবর্তনের পথে এগিয়ে গেল দেশ। সুপ্রিম কোর্ট সোমবার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা বা SIR (Special Intensive Revision)-এ আধার কার্ডকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ১২তম বৈধ নথি হিসেবে। আদালতের বেঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী। তাঁদের নির্দেশ অনুযায়ী, আধার কার্ড এখন থেকে অন্যান্য ১১টি নথির সঙ্গে সমানভাবে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে।
আধার: পরিচয়, কিন্তু নাগরিকত্ব নয়
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, আধার কার্ড কখনওই নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। নাগরিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট বা জন্ম শংসাপত্রের মতো নথিই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। তবে Representation of People’s Act-এর ধারা ২৩(৪) অনুযায়ী, আধার একটি বৈধ পরিচয়পত্র। তাই ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে গণ্য করা যাবে।
কেন উঠল আধার বিতর্ক?
গত কয়েক বছরে ভোটার তালিকা সংশোধন বা নতুন নাম অন্তর্ভুক্তির সময় বহু ভোটারের আধার কার্ড গ্রহণ করা হয়নি। আরজেডি এবং অন্যান্য আবেদনকারীরা আদালতে অভিযোগ করেন যে, নির্বাচন কমিশনের মাঠকর্মীরা বা Booth Level Officers (BLOs) আধার কার্ডকে বৈধ নথি হিসেবে মেনে নিচ্ছেন না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আধার জমা দেওয়ার পরও ভোটার তালিকায় নাম ওঠেনি।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কপিল সিব্বল আদালতে জানান যে, আধারকে বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করার জন্য ইতিমধ্যেই তিনটি পৃথক আদেশ জারি হয়েছে। তবুও BLO বা ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসাররা এটিকে মেনে নিচ্ছেন না। এই প্রেক্ষিতেই সুপ্রিম কোর্ট এবার স্পষ্ট নির্দেশ দিল নির্বাচন কমিশনকে।
সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট বার্তা
সোমবারের রায়ে বিচারপতিরা বলেন, “এখন থেকে ১১ নয়, ১২টি নথি গ্রহণযোগ্য হবে SIR-এর ক্ষেত্রে। আর আধার কার্ডই হবে সেই নতুন নথি।” একই সঙ্গে আদালত কমিশনের কর্মকর্তাদের অধিকার দিয়েছে আধার কার্ডের সত্যতা যাচাই করার জন্য। অর্থাৎ, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির আগে আধার জমা দিলে BLO বা অন্য কর্তারা সেটির বৈধতা পরীক্ষা করতে পারবেন।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী আদালতে জানান যে, আধারকে নাগরিকত্ব প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। তবে তিনি এটাও মেনে নেন যে, পরিচয় প্রমাণ হিসেবে আধারকে রাখা যেতে পারে। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য একাধিক বিকল্প নথি রয়েছে, আধারও তার মধ্যে থাকবে। ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে ভোটারদের এই বিষয়ে অবগত করানো হয়েছে।
বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী স্পষ্ট করে বলেন, “পাসপোর্ট আর জন্ম শংসাপত্র ছাড়া বাকি যে ১১টি নথি কমিশন নির্ধারণ করেছে, সেগুলোর কোনওটিই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। তাই আধারকে বাদ দেওয়ার কোনও যুক্তি নেই।” একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে, কোনও নথিই জাল করা থেকে রেহাই পায় না, তাই আধারকেও আলাদা করে অবিশ্বাস করার কারণ নেই।
ভবিষ্যতের প্রভাব
বর্তমানে এই নিয়ম কেবল বিহারের জন্য প্রযোজ্য হলেও, স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে যে আগামী দিনে গোটা দেশজুড়েই SIR-এর প্রক্রিয়ায় আধারকে বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজ হয়ে উঠবে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছে, যাদের কাছে প্রায়শই অন্যান্য নথি থাকে না, তাঁদের জন্য আধার একটি বড় সহায়ক হতে চলেছে।

সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে নতুন দিশা দেখাল না, একই সঙ্গে পরিষ্কার বার্তা দিল যে আধার একটি পরিচয়পত্র, কিন্তু নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় অংশগ্রহণের অন্যতম শর্ত ভোটার তালিকায় নাম থাকা। আর আধার কার্ডকে বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করার ফলে আরও বেশি নাগরিকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।