শৌভিক তালুকদার। কলকাতা সারাদিন।
‘বিএলও-রা হুমকির মুখে আছেন। এটা একটা সিরিয়াস বিষয়। বিএলও-দের নিরাপত্তা দিতে হবে।’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের যাবতীয় দাবি উড়িয়ে দিয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যকে মান্যতা দিয়ে এমন তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ জানালেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত। বাংলা সহ বিজেপি বিরোধী কেরালা এবং তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলোতে বুথ লেভেল অফিসাররা নির্বাচন কমিশনের চাপে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ করে মামলা দায়ের হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। আজ সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চে শুনানি চলাকালীন জাতীয় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে দাবি করা হয়, বিএলও-দের নিরাপত্তায় দেওয়া হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনের দাবি, বিএলও-দের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব রাজ্যের।
এই বক্তব্য শোনার পরেই বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, ‘আমরা শুনেছি কমিশনের চাপে বিএলও-রা আন্দোলন করছেন। সিইও অফিস ঘেরাও করা হয়েছে। এটা শুধু ডেস্ক জব নয়। তাঁদের বাড়ি বাড়ি যেতে হচ্ছে। তাই এই কাজটা বেশি। তাঁরা চাপে আছেন।’ মামলাকারীর আইনজীবী বলেন, ‘রাজ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে নিরাপত্তা দিতে। তাই সিআরপিএফ চেয়ে আমরা চিঠিও লিখেছি।’ রাজনৈতিক চাপ আছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘বিএলও-রা হুমকির মুখে আছেন। এটা একটা সিরিয়াস বিষয়। বিএলও-দের নিরাপত্তা দিতে হবে।’ অতিরিক্ত চাপের যে অভিযোগ উঠেছে, সেই প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গড়ে প্রতিদিন ৩৭ জন ভোটারের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে বিএলও-দের। দিনে ৭-৮টি বাড়ি ঘুরলেই সেই কাজ সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে। বিচারপতি বাগচী স্পষ্ট বলেন, ‘বিএলও-দের উপর যেন অতিরিক্ত চাপ না আসে। তাঁরাই মূল কাজটি করছেন। বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, তথ্য আপলোড করছেন। প্রয়োজনে বিএলও-র সংখ্যা বাড়ানো হোক।’ কমিশন জানিয়েছে, বিএলও-দের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে তারা অবিলম্বে রাজ্যকে চিঠি দেবে।
এই পরিস্থিতিতে ব্লক লেভেল অফিসারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় বাহিনী নামানো বা রাজ্য পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবিতে দায়ের করা একটি আবেদনে নির্বাচন কমিশন ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে নোটিস পাঠাল সুপ্রিম কোর্ট। ‘সনাতনী সংসদ’ নামে একটি সংগঠনের তরফে দায়ের এই জনস্বার্থ মামলায় দাবি করা হয়েছে, রাজ্যের বিভিন্ন অংশে এসআইআর-এ নিযুক্ত বিএলও-দের উপর হামলা, বাধা ও ভয় দেখানোর ঘটনা ঘটছে। সেই কারণেই কমিশনের পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
মামলাটির শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির বেঞ্চ জানায়, পিটিশনে অভিযোগের পক্ষে যে তথ্য হাজির করা হয়েছে, তা অত্যন্ত সীমিত। সমগ্র রাজ্য সম্পর্কে মন্তব্য বা নির্দেশ দেওয়ার জন্য একটিমাত্র এফআইআর-এর উল্লেখ যথেষ্ট নয়—এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে আদালত বলে, অভিযোগের বেশিরভাগই অতীতের উদাহরণ বা সংবাদপত্রের প্রতিবেদন নির্ভর। আদালত প্রশ্ন তোলে, এই বিচ্ছিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে কি পশ্চিমবঙ্গের জন্য আলাদা নিরাপত্তা নির্দেশ দেওয়া সম্ভব?
পিটিশনারের পক্ষে যুক্তি দেন সিনিয়র আইনজীবী ভি. গিরি। তিনি জানান, রাজ্যে বারবার বিএলও-দের উপর হামলার ঘটনা ঘটছে এবং রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। যেহেতু রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনে সম্মতি দিচ্ছে না, তাই আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়া বিএলও-দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি বিএলও-দের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষার ব্যবস্থাও চান। কিন্তু আদালত তাতে সঙ্গে সঙ্গে সুরাহা দেয়নি। বিচারপতি বাগচি পাল্টা বলেন, যে এফআইআর-এর কথা বলা হয়েছে, সেটি ছাড়া কোনও বিশ্বাসযোগ্য নথি বা পরিসংখ্যান নেই, আর বিএলও-দের চাপ বা ঝুঁকি নিয়ে বাকি প্রশ্নগুলি বিশ্লেষণ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ‘ন্যারেটিভ’ মাত্র।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে আদালতে হাজির হন সিনিয়র আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী। তিনি বলেন, রাজ্যের বেশ কয়েকটি জায়গায় বিএলও-দের বাধা দেওয়া হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ইলেক্টোরাল অফিসারদের ঘেরাও করার ঘটনাও ঘটেছে। যদিও তিনি স্বীকার করেন, রাজ্য পুলিশই বিএলও-দের সুরক্ষা দেওয়ার প্রথম দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। রাজ্য যদি তা পালন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইসির কাছে স্থানীয় পুলিশকে ডেপুটেশনে নিয়ে কাজ করার পথ খোলা রয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কমিশন সতর্ক থাকতে চায়।