রাহুল সিংহ মজুমদার। কলকাতা সারাদিন।
পূর্ব কলকাতার জলাভূমিতে বেআইনি দখল ও অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিল কলকাতা হাইকোর্ট। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে আদালত জানিয়ে দিল—অবৈধ নির্মাণে রেজিস্ট্রেশন হবে না, বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া যাবে না। শুধু তাই নয়, কোথায় কোথায় জলাভূমি ভরাট করে অবৈধ নির্মাণ হয়েছে, সেই পুরো তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে—এমন নির্দেশও দিয়েছে বিচারপতি অমৃতা সিনহার বেঞ্চ।
এই রায়কে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা “গেম চেঞ্জার” বলছেন। কারণ, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি (East Kolkata Wetlands) আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘রামসার সাইট’। এখানে বড়সড় পরিবেশ অপরাধ থামাতে আদালতের এই হস্তক্ষেপ যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, তা স্পষ্ট।
অবৈধ নির্মাণে সর্বাত্মক লাগাম টানতে আদালতের ৩ বড় নির্দেশ
বিচারপতি অমৃতা সিনহা তিনটি স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশ জারি করেছেন—
১) অবৈধ নির্মাণের পূর্ণ তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ
জলাভূমি এলাকার কোন কোন প্লটে দাগ-নম্বরসহ অবৈধ নির্মাণ হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তালিকা অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে।
এতে সাধারণ মানুষ সহজেই বুঝতে পারবেন কোন জমি বা বাড়ি বেআইনি। জমি কেনা-বেচার নামে যে একটি “বিশেষ চক্র” সক্রিয়, তাদের কার্যকলাপও প্রকাশ্যে আসবে।
২) অবৈধ নির্মাণে রেজিস্ট্রেশন ‘সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ’
কোনও বেআইনি নির্মাণ ভবিষ্যতে রেজিস্ট্রেশন করানো যাবে না।
রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষকে আদালত স্পষ্টভাবে বলেছে— “অবৈধ নির্মাণকে কোনওভাবে বৈধতার সীল দেবেন না।”
৩) বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ—CESC এবং বিদ্যুৎ পরিষদকে কঠোর নির্দেশ
যেসব ভবন বা দালান বেআইনি ভাবে দাঁড়িয়ে গেছে, সেগুলিকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া যাবে না,
এমনকি ‘অস্থায়ী’ সংযোগও নয়।
এই নির্দেশ কার্যকর হলে বহু বেআইনি নির্মাণ স্বাভাবিকভাবেই অচল হয়ে পড়বে।
হাইকোর্টের স্পষ্ট অবস্থান: “জলাভূমি রক্ষা জরুরি, না হলে বিপর্যয় অনিবার্য”
রাজ্য সরকার এবং ওয়েটল্যান্ডস ম্যানেজমেন্ট অথরিটির পেশ করা রিপোর্ট দেখে আদালত বিস্ময় প্রকাশ করেছে।
রিপোর্টে দেখা গেছে— পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে গত কয়েক বছরে ব্যাপক হারে বেআইনি নির্মাণ হয়েছে।
সংখ্যা এতটাই বেশি যে পুরসভা “হিমশিম খাচ্ছে”—এমন মন্তব্যও করেছেন বিচারপতি।
পরিবেশ আইন অনুযায়ী এই জলাভূমি এলাকা ‘সংরক্ষিত’। এখানে যে কোনও নির্মাণই অপরাধ।
কিন্তু তবুও বহু জায়গায় জলাভূমি ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে—
• বাড়ি
• গোডাউন
• কারখানা
• রিসর্ট
• বাণিজ্যিক ভবন
ফলে আদালত এবার জোরালো বার্তা দিল—এবার আর কোনও ছাড় নয়।
পূর্ব কলকাতা জলাভূমি শুধু জলাশয় নয়, এটি কলকাতা শহরের “প্রাকৃতিক ফিল্টার”—যেখানে প্রতিদিন শহরের বর্জ্য জল প্রাকৃতিকভাবে পরিশোধিত হয়।
২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অবৈধ নির্মাণ ভাঙার রোডম্যাপ জমা দিতে হবে
হাইকোর্ট জানিয়েছে— এলাকায় ইতিমধ্যেই যে সব বেআইনি নির্মাণ রয়েছে, সেগুলি ভাঙতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তার বিস্তারিত রোডম্যাপ ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আদালতে জমা দিতে হবে।
রোডম্যাপ পাওয়ার পর আদালত পরবর্তী নির্দেশ দেবে।
এবার প্রকাশ্যে আসবে পুরো বেআইনি দখলের ‘মানচিত্র’
পূর্ব কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস ম্যানেজমেন্ট কর্তৃপক্ষকে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে—
অনলাইন তালিকায় প্লট নম্বর, দাগ নম্বর, অবস্থান—সব থাকতে হবে।
এই তালিকা প্রকাশ্যে এলে—
• সাধারণ মানুষ জমি কেনার আগে সতর্ক হতে পারবেন
• প্রতারণা বন্ধ হবে
• বেআইনি দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে
• বাণিজ্যিক চক্রগুলির কার্যকলাপ প্রকাশ্য হবে
এটি পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি শহরের সঠিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
কেন এই নির্দেশ গুরুত্বপূর্ণ?
• East Kolkata Wetlands (SEO Keyword) আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত এলাকা
• কলকাতার দূষিত জল প্রাকৃতিকভাবে পরিশোধিত হয়
• জলাভূমি ধ্বংস হলে বর্জ্য জলের সঙ্কট তৈরি হবে
• বন্যা ঝুঁকি বাড়বে
• বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়বে
পরিবেশবিদদের মতে, এই নির্দেশ “আইনি লড়াইয়ে একটি বড় জয়”।
কলকাতা হাইকোর্টের এই রায় শুধু একটি মামলা নয়, এটি পূর্ব কলকাতার জলাভূমি রক্ষার লড়াইয়ে এক ঐতিহাসিক মোড়।
অবৈধ নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে এবার কার্যত “জিরো টলারেন্স” ঘোষণা করে দিল আদালত।
পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও কঠোর পদক্ষেপ দেখা যেতে পারে।
এখন নজর ২৩ ফেব্রুয়ারির শুনানি—যেখানে স্পষ্ট হবে, পূর্ব কলকাতার জলাভূমি বাঁচাতে রাজ্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন পথে এগোবে।